হোমপেজ লোড হচ্ছে…
জ্ঞানেশ কুমারকে সরালেও বিপদ, রাখলেও বিপদ—নিজের পাতা ফাঁদে নিজেই পড়ল মোদি সরকার
মো. আবু হুরাইরাহ্

একজন কর্মকর্তাকে বাঁচাতে রাজধানী অবরুদ্ধ করেছে ভারতের মোদি সরকার। ৩০ হাজার পুলিশ, হাজার হাজার আটক, তবু ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার প্রশ্নে অনড় তারা। বিশ্লেষকদের মতে, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ মানে অপরাধ স্বীকার, আর সেই ঝুঁকি নিতে রাজি নয় দিল্লি।
নয়াদিল্লিতে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি উড়োজাহাজ অবতরণের পর পুলিশের একটি দল ভেতরে ঢুকল। তাদের এগিয়ে আসতে দেখে অভিজিৎ দিপকে বললেন, ‘আমি গ্রেপ্তার হতে এসেছি। আপনাদের ভয় পাই না।’ তাঁর পোস্ট করা ইনস্টাগ্রাম ভিডিওতে দৃশ্যটি ধরা আছে।
মুম্বাই থেকে আসা ওই উড়োজাহাজ থেকেই আটক করা হয় ভারতে তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা দিপকেকে (কয়েক দিন পর মুচলেকায় মুক্ত)। সঙ্গে আটক হন দুই সহযোগী সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা (তাঁদের কারা হেফাজতের মেয়াদ আরও দুই দিন বৃদ্ধি করা হয়েছে)। রাঙ্কার পোস্ট করা আরেকটি ভিডিওতে শোনা যায় দিপকের কণ্ঠ—‘এটা স্বৈরাচারী শাসন।’
দিনটি ছিল ১০ অক্টোবর। ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রধান (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে রাজধানীতে বড় সমাবেশের ডাক দিয়েছিল সিজেপি ও বিরোধী দলগুলো। সরকার সেই সমাবেশ ঠেকাতে রাজধানীকে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলে। এরপরও জ্ঞানেশ কুমার নিজের পদে আছেন, আর সরকার তাঁর পাশে অনড় দাঁড়িয়ে আছে। ক্ষমতাসীন বিজেপিদলীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রী রামদাস আঠাওয়ালে সরাসরি বলে দিয়েছেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের কোনো সম্ভাবনাই নেই।’
প্রশ্ন হলো, একজন কর্মকর্তাকে রাখতে সরকার এত বড় রাজনৈতিক মূল্য দিচ্ছে কেন? কী আছে এ লড়াইয়ের পেছনে, আর কেনই–বা সরকার এক পা-ও সরতে রাজি নয়?
পরদিন ১১ অক্টোবর (রোববার) পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টায়। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এসব আটককে অবৈধ বলে উল্লেখ করলে অনেককে ছেড়ে দেওয়া হয়। মুক্তি পেয়ে অভিজিৎ দিপকে এক্সে লেখেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি ভারতের জন্য “অস্বস্তির কারণ”। এই দেশ আগে কখনো তাঁর চেয়ে বড় কাপুরুষ ও দাদাগিরি করা লোক দেখেনি।’অবরুদ্ধ রাজধানী ১০ অক্টোবর (শনিবার) বিক্ষোভের আগে নয়াদিল্লিতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২ কোটি মানুষের এই শহরে তাঁদের সংখ্যা ছিল ৩০ হাজারের বেশি। লক্ষ্য ছিল একটাই, বিক্ষোভকারীরা যেন পার্লামেন্টের কাছে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে না পারেন। এ জন্য যা যা করা হয়েছে:
—ট্রেন ও মেট্রো চলাচল বন্ধ রাখা
—বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক আটকে দেওয়া
—ব্যারিকেড দিয়ে যন্তর মন্তর বন্ধ করা
—শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথে তল্লাশিচৌকি বসানো
—বাসে তল্লাশি, যানবাহন পরীক্ষা করা
—সিজেপি ও অন্যান্য সংগঠন যাতে অনলাইনে লোকজনকে সংগঠিত করতে না পারে, সে জন্য রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা
সমাবেশ শুরুর আগেই আটক করা হয় আন্দোলনের পরিচিত মুখ রত্না সিং, অভিজিৎ দিপকে ও জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে। আটক হন বামপন্থী সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) কেন্দ্রীয় সভাপতি নেহা বোরা। এ সংগঠন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) সঙ্গে যুক্ত। মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধীসহ আরও বহু স্বনামধন্য অধিকারকর্মীও আটক হন। টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিবেদনে দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নকেও আটক করা হয়েছিল।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের সময় এক আন্দোলনকারীকে আটক করে নিয়ে যাচ্ছেন নিরাপত্তাকর্মীরা। নয়াদিল্লি, ভারতএত বাধার মধ্যেও হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নামেন। দিনভর পুলিশ আর আন্দোলনকারীদের মধ্যে চলে ইঁদুর-বিড়াল খেলা। এক জায়গা থেকে তাড়িয়ে দিলে তাঁরা অন্য কোনায় গিয়ে জড়ো হন। জনপ্রিয় বাজার দিল্লি হাটেও ছোট ছোট বিক্ষোভ হয়, যদিও পুলিশ সেসব ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকেরাও রেহাই পাননি। সন্ধ্যার মধ্যে অন্তত ২ হাজার ৫০০ বিক্ষোভকারী ও ১৫ সাংবাদিককে আটক করে আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। মুম্বাইয়েও বিক্ষোভ ঘিরে আটক করা হয় প্রায় ৬০০ জনকে।
পরদিন ১১ অক্টোবর (রোববার) পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টায়। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এসব আটককে অবৈধ বলে উল্লেখ করলে অনেককে ছেড়ে দেওয়া হয়। মুক্তি পেয়ে অভিজিৎ দিপকে এক্সে লেখেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি ভারতের জন্য “অস্বস্তির কারণ”। এই দেশ আগে কখনো তাঁর চেয়ে বড় কাপুরুষ ও দাদাগিরি করা লোক দেখেনি।’
সৌরভ দাস লেখেন, অমিত শাহ ও নরেন্দ্র মোদি দিল্লিকে দুর্গে পরিণত করে নিজেদের নাগরিকদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ শুরু করেছেন। তাঁর ভাষ্য, তরুণ প্রজন্ম জবাবদিহি চেয়ে যাবে; ভয় দেখিয়ে বা কণ্ঠ রোধ করে তাদের থামানো যাবে না, তারা আরও শক্তি নিয়ে ফিরে আসবে।
সরকারের এমন কড়াকড়ি দেখে অনেকের মনে পড়ছে সত্তরের দশকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সময় জারি করা জরুরি অবস্থার দিনগুলোর কথা।
একটি প্রতিবেদন, তারপর আগুন এ বিক্ষোভের শুরুটা কীভাবে? ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন নিয়ে ক্ষোভ আগে থেকেই ছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পরিস্থিতি পাল্টে দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধন পদ্ধতি ও ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের দুজন কমিশনার উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার তাঁরা জ্ঞানেশ কুমারকে সেই উদ্বেগের কথা জানান। কিন্তু সেগুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
ভারতের নির্বাচন কমিশন তিন সদস্যের একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়। অর্থাৎ তিনজনের মধ্যে দুজনই কুমারের সিদ্ধান্তে আপত্তি তুলেছিলেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের তথ্যভান্ডার কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভোটার তালিকার ভুল সংশোধনে বাধা দিচ্ছে। অথচ আইন অনুযায়ী এ সংশোধনের ক্ষমতা তাঁদেরই আছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলো এবং তরুণদের নেতৃত্বাধীন সিজেপি দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু করে। কয়েকটি শহরে বিচ্ছিন্নভাবে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ক্রমে বড় আকার নেয়।
১৩ কোটি নাম উধাও বিতর্কের কেন্দ্রে আছে ভোটার তালিকার এ বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন)। প্রায় ১০০ কোটি ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের এ উদ্যোগ শুরু হয়েছিল গত বছর, বিহার রাজ্যের নির্বাচনের আগে। সেখানে এখন বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায়। এখন ভারতের অধিকাংশ রাজ্যে তালিকা পর্যালোচনা হয়েছে। উত্তর প্রদেশে এ যাচাই শুরু হয় ২০২৫ সালের অক্টোবরে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, সেখানে তালিকা থেকে ১৩ শতাংশ নাম বাদ গেছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন ভারতে নিয়মিত প্রক্রিয়া। কিন্তু বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে বিপুলসংখ্যক ভোটার তালিকায় নিজের নাম না পেয়ে বিস্মিত হয়েছেন। অনেকে ভোটও দিতে পারেননি। বিরোধীদের দাবি, নির্বিচার নাম বাদ দেওয়া এবং দীর্ঘ আপিলপ্রক্রিয়ার কারণে দুই রাজ্যে লাখ লাখ মানুষ ভোট দিতে পারেননি। গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসে বিজেপি।
সংখ্যাটা বিশাল। বিজেপি নির্বাচন কমিশনের তথ্যের বরাত দিয়ে জানায়, যাচাইয়ে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সংখ্যা জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। বিজেপির হিসাবে বাদ পড়াদের মধ্যে আছেন:
—২ কোটি ৮০ লাখ ব্যক্তি মৃত
—৬ কোটি ৩০ লাখ ব্যক্তি আগের ঠিকানা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন
—১ কোটি নাম একাধিকবার রয়েছে
—৩ কোটি ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া যায়নি
নির্বাচন কমিশন অবশ্য বিষয়টি একটু ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। কমিশনের দাবি, এসআইআরের উদ্দেশ্য ছিল শুধু তালিকা হালনাগাদ করা। এ জন্য মৃত, অন্যত্র চলে যাওয়া, খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, এমন ব্যক্তি বা একাধিক নির্বাচনী এলাকায় নাম থাকা ভোটারদের শনাক্ত করার কথা। প্রায় ১৩ কোটি নামকে এমন শ্রেণিতে ফেলা হয়েছে।
কিন্তু কমিশন জোর দিয়ে বলেছে, এর অর্থ এ নয় যে সব নামই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। যোগ্য ভোটারদের আবার অন্তর্ভুক্তির আবেদন করার সুযোগও আছে।
ভোটার তালিকা থেকে গণহারে নাগরিকদের নাম বাদ দেওয়ার কাজটি হয়েছে সরাসরি আইনকে মাড়িয়ে। এর জন্য দায়ী হিসেবে যাঁর নাম আসছে, তিনি হলেন আজকের ভারতের সিইসি জ্ঞানেশ কুমারবিরোধী দল ও সমালোচকদের কাছে এ ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। তাঁদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলকে সুবিধা দিতে কৌশলগতভাবে কোটি কোটি ভোটারের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এ উদ্যোগ। তাঁদের মতে, এত বিপুলসংখ্যক নাম যাচাই, আবার অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র দাখিল এবং ভুল সংশোধনের জটিল প্রক্রিয়া—সব মিলিয়ে যোগ্য ভোটারদের পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যাঁদের নাম তালিকায় নেই, তাঁদের আবার ভোটার হতে নিজেদের পরিচয় ও যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হচ্ছে। এ নিয়ে এই ভোটারদের অনেকেও অভিযোগ করেছেন।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বাদ পড়াদের মধ্যে মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু ভোটার তুলনামূলক বেশি। এসব জনগোষ্ঠীর হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপিকে সমর্থন করার সম্ভাবনা কম।
প্রক্রিয়াটির কারিগরি ত্রুটি ও স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধীরা বলছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনের ফলেও কোটি কোটি ভোটার বাদ পড়ার প্রভাব পড়েছে, আর ওই নির্বাচনগুলোয় জিতেছে বিজেপি।
এ বিক্ষোভের শুরুটা কীভাবে? ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন নিয়ে ক্ষোভ আগে থেকেই ছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পরিস্থিতি পাল্টে দেয়।বিজেপির জবাব অন্য রকম। দলটির দাবি, নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা ও ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিসহ নানা কারণেই তারা নির্বাচনে আধিপত্য ধরে রেখেছে। বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে ভুল তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ করেছে তারা।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। কোনো রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ কমিশন অস্বীকার করছে। তবে কমিশন স্বীকার করছে, কমিশনাররা আপত্তি জানিয়েছিলেন। তবে কমিশনের ভাষ্য, নিয়মিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই তা তোলা হয়েছিল।
ঝুঁকি কোথায় সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ। আগামী বছর ভারতের অন্তত সাতটি রাজ্যে নির্বাচন হবে। এর মধ্যে আছে বিজেপিশাসিত উত্তর প্রদেশও। দেশের সবচেয়ে জনবহুল এ রাজ্যকে জাতীয় রাজনীতির প্রবণতা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হয়। বিরোধীদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতের নির্বাচনেও এই পদ্ধতিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। তাঁদের মতে, বিষয়টি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের নির্বাচনব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার যাচাই প্রক্রিয়ায় জ্ঞানেশ কুমার পক্ষপাত করছেন এবং পুরো প্রক্রিয়ায় লাভবান হচ্ছে বিজেপি। এ জায়গা থেকেই তাঁর পদত্যাগের দাবি উঠেছে।
‘পদত্যাগই গণতান্ত্রিক রীতি’, কিন্তু জ্ঞানেশ বহাল এখানেই আসে সেই প্রশ্ন: সরকার কেন সিইসি জ্ঞানেশকে ছাড়ছে না? রাজনৈতিক তাত্ত্বিক রাজীব ভার্গব দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে একসময় শিক্ষকতা করেছেন। দ্য ইনডিপেনডেন্টকে তিনি বলেন, প্রশ্নটি শুধু কুমার কেন পদত্যাগ করবেন না, তা নয়; সরকার তাঁকে রক্ষা করতে এতটা মরিয়া কেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ভার্গবের কথায়, ‘কোনো সন্দেহ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি গণতান্ত্রিক সরকার ওই ব্যক্তিকে পদত্যাগ করাত।’
ভার্গব মনে করিয়ে দেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা এবং নির্বাচনপ্রক্রিয়া সুষ্ঠু নয়—এমন যুক্তিসংগত সন্দেহ দূর করা। ভার্গবের ভাষায়, ‘তাঁর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করা সম্ভব নয়।’
ভারতের নির্বাচন কমিশনার (ইসি) সুখবীর সিং সান্ধু (বাঁয়ে), সিইসি জ্ঞানেশ কুমার (মাঝে) ও ইসি বিবেক যোশিদ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনকে ভার্গব হালকাভাবে দেখছেন না। তাঁর মতে, ওই প্রতিবেদনে কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা সন্দেহের যথার্থতা অনেকটাই প্রমাণিত হয়েছে। তাঁর যুক্তি, প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ তিন নির্বাচন কমিশনারেরই সেদিন পদত্যাগ করা উচিত ছিল।
‘তাঁরা (তিন কমিশনার) তা করেননি। এতে মানুষের এই সন্দেহই আরও জোরালো হয়েছে যে সরকার ও নির্বাচন কমিশন পরস্পরের যোগসাজশে কাজ করছে।’
এখানে আরেকটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। ভার্গবের মতে, জ্ঞানেশের পক্ষে সরকারের প্রকাশ্য অবস্থান সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, যার নির্বাহী বিভাগের বাইরে থেকে কাজ করার কথা। কিন্তু সরকারের প্রতিনিধিরা যখন কমিশনপ্রধানকে নিজেদের প্রশাসনেরই একজন সদস্যের মতো রক্ষা করেন, তখন আপাতদৃষ্টিতে স্বাধীন প্রতিষ্ঠানটিকে রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে হয়।
সরকার কেন ছাড়ছে না আল-জাজিরা ও দ্য ইনডিপেনডেন্টের সঙ্গে কথা বলা বিশ্লেষকদের বক্তব্য থেকে সরকারের অনড় অবস্থানের পেছনে কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে।
প্রথমত, পদত্যাগ মানে স্বীকারোক্তি। আল-জাজিরার সঙ্গে কথা বলা সমালোচক ও বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি মেনে নিলে ভোট চুরির বিষয়ে বিরোধীদের অভিযোগকে কার্যত স্বীকৃতি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নিয়ে ‘সচেতন’ প্রধানমন্ত্রী মোদির দুর্বলতাও প্রকাশ পাবে।
দ্বিতীয়ত, উত্তরসূরির অনিশ্চয়তা। ভার্গবের ধারণা, জ্ঞানেশ কুমারকে পদে রাখার পেছনে তাঁর সরে যাওয়ার সম্ভাব্য পরিণতির ভয় কাজ করতে পারে। সরকার চাইলে তাঁকে সরিয়ে অন্য কাউকে বসাতে পারত এবং প্রতিষ্ঠানটির ওপর আস্থা ফেরানোর দাবি করতে পারত। কিন্তু ভার্গবের মতে, সরকার সেই ঝুঁকি নিতে চাইছে না। কারণ, জ্ঞানেশের উত্তরসূরি মোদি সরকারের স্বার্থের প্রতি অনুকূল হবেন কি না, তা নিশ্চিত নয়।
তৃতীয়ত, লড়াইটা একজন মানুষের নয়। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অপূর্বানন্দ (তিনি নিজের নামের সঙ্গে দ্বিতীয় কোনো নাম ব্যবহার করেন না) বলেন, ‘বিষয়টি আসলে শুধু জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে নয়।’ তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে বৃহত্তর পরিকল্পনার একটি হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর অভিযোগ, ‘এর মধ্য দিয়ে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে বিকৃত করা হচ্ছে এবং বিজেপির স্বার্থ পূরণে কারসাজি করা হচ্ছে।’
সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে ভারতে শুরু হয়েছে বিক্ষোভঅপূর্বানন্দের ব্যাখ্যায়, সরকার শুধু জ্ঞানেশকে নয়, ভোটার তালিকা সংশোধনের এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত বৃহত্তর রাজনৈতিক কর্তৃত্বকেও রক্ষা করছে। একজন কর্মকর্তাকে বদলালেই নির্বাচনী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সাম্প্রতিক পদ্ধতি নিয়ে ওঠা মৌলিক প্রশ্নগুলোর সমাধান হবে না। জ্ঞানেশের পদত্যাগ দাবি না মেনে সরকার বরং কমিশনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়িয়ে তুলেছে বলেও তিনি মনে করেন।
চতুর্থত, ‘অপরাজিত নেতা’র ভাবমূর্তি। মোদির জীবনীকার ও লেখক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় আল-জাজিরাকে বলেন, ‘মোদি এমন এক নেতার ভাবমূর্তি ধরে রাখতে চান, যিনি জনদাবিতে কখনো নতিস্বীকার করেন না এবং যিনি অপরাজিত। তাই এবার তিনি আন্দোলনকারীদের সেন্ট্রাল দিল্লিতে জমায়েত হওয়া ঠেকাতে চরম পদক্ষেপ নিয়েছেন।’
এখানে একটা বৈপরীত্যও আছে। নীলাঞ্জনের মতে, জনগণের দৃষ্টিতে মোদি এখন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে নিম্ন অবস্থানে। অথচ দেশের প্রধান স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, আমলাতন্ত্রের বড় অংশ ও সরকারি সংস্থাগুলো এখনো তাঁর শক্ত নিয়ন্ত্রণে। অব্যাহত প্রতিবাদের মুখে মোদি যে সাধারণ মানুষকে সংকট থেকে বের করে আনার নেতা, সেই ভাবমূর্তি দ্রুত হারাচ্ছেন বলেও তিনি মনে করেন।
আগামী বছর ভারতের অন্তত সাতটি রাজ্যে নির্বাচন হবে। এর মধ্যে আছে বিজেপিশাসিত উত্তর প্রদেশও। দেশের সবচেয়ে জনবহুল এ রাজ্যকে জাতীয় রাজনীতির প্রবণতা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা হয়। বিরোধীদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতের নির্বাচনেও এটিকে (এসআইআর) রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। তাঁদের মতে, বিষয়টি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের নির্বাচনব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।আলোচনা নয়: নীরবতা, তারপর শক্তি বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনায় কেন বসছে না সরকার? ভার্গব বলেন, গণতন্ত্রে এ ধরনের বিরোধের মীমাংসা হওয়া উচিত সংসদে বিতর্ক এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে। কিন্তু এসব পথ অকার্যকর মনে হলে ও আদালত সময়মতো সমাধান দিতে না পারলে—এ ঘটনায় যেমন ঘটছে—মানুষের মনে হতে পারে, রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
ভার্গবের বিশ্লেষণে সরকারের কৌশল স্পষ্ট। প্রথমে নীরব থাকা, পরে শক্তি প্রয়োগ। প্রত্যাশা, একসময় জনরোষ এমনিতেই কমে আসবে। তাঁর ভাষায়, ‘এ সরকার বেশ একগুঁয়ে। কোনো দাবির প্রতিই সাড়া দেয় না। তাদের প্রতিক্রিয়া হলো শক্তি প্রয়োগ করে দমন করা, নির্লজ্জভাবে নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকা। আলোচনা বা কথোপকথনের বদলে নীরব থাকা, তারপর শক্তি প্রয়োগ করা। আর অপেক্ষা করা, কখন পরিস্থিতি ঠান্ডা হবে।’
এ নীরবতার প্রমাণ পাওয়া যায় অমিত শাহর আচরণে। মোদির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও এ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণেই বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে মোতায়েন করা হয় পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের। বিক্ষোভ শুরুর পর তিনি দীর্ঘদিন মুখ খোলেননি। অবশেষে সম্প্রতি মুখ খুললেন। বারবার নির্বাচনে হারের পর নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার বদলে তিনি প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসকে আত্মসমালোচনার পরামর্শ দিলেন।
ভারতের ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেবিজেপির অন্য নেতারাও বিক্ষোভকে বৈধ ক্ষোভের প্রকাশ হিসেবে দেখছেন না। তাঁদের চোখে বিক্ষোভ ও অনলাইনে সরকারের সমালোচনা সরকারকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পিত রাজনৈতিক চেষ্টা। ১১ অক্টোবর দলটির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র বিক্ষোভকারীদের ‘নৈরাজ্যবাদী’ বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, তাঁদের ‘ব্যর্থ প্রদর্শনী পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হয়েছে’। যন্তর মন্তরে যা ঘটছে এবং টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা দেখানো হচ্ছে, তা ভারতের সামগ্রিক চিত্র নয় বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ভারতের পরিস্থিতি শান্ত।
অথচ গত জুলাইয়ে চিত্রটা ছিল ভিন্ন। তখন সরকার তরুণ সংগঠনগুলোর সঙ্গে সাময়িকভাবে আলোচনায় বসেছিল। এবার সাংবিধানিক ও নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের পদত্যাগের দাবির মুখে তারা অনেক বেশি কঠোর।
বিরোধীদের নিয়ে ‘গোপন হিসাব’ অপূর্বানন্দের বিশ্লেষণের আরেকটি দিক আছে, যা সরকারের নিরাপত্তা-তৎপরতাকে নতুন আলোয় দেখায়। তাঁর মতে, বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের মধ্য দিয়ে সরকার বিজেপির মূল সমর্থক গোষ্ঠীকে একটি বার্তা দিতে চাইছে। তা হলো, রাজনৈতিক বয়ান বাধার মুখে পড়লেও নিয়ন্ত্রণ এখনো তাদের হাতেই। বিরোধীদের সমালোচনা মেনে নেওয়ার বদলে নিজেদের কর্তৃত্ব তুলে ধরতেই এই দমন-পীড়ন।
সিইসিকে বাঁচাতে মোদি সরকারের এমন অনড় অবস্থানের আরও একটি কারণ এই বিশেষজ্ঞ দেখেন। রাহুল গান্ধীর মতো বিরোধী নেতাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসার অর্থ হলো, তাঁদের দেশের বৈধ রাজনৈতিক পক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। অপূর্বানন্দ বলছেন, ক্ষমতায় থাকার ১২ বছরে বিজেপি তা করতে বরাবরই অনাগ্রহ দেখিয়েছে।
সীমানা পেরোচ্ছে আন্দোলন বিরোধীরাও পিছিয়ে নেই। ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্বে থাকা কংগ্রেস তরুণদের সঙ্গে বিক্ষোভে নেমেছে। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কে সি ভেনুগোপাল সাংবাদিকদের জানান, বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে তাঁরা বিস্তারিত বৈঠক করেছেন। তাঁর কথা, ‘জ্ঞানেশকে বিদায় নিতেই হবে। আমরা পিছু হটব না।’
বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী কয়েক মাস ধরে নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছেন। সম্প্রতি দিল্লিতে নির্বাচনসংক্রান্ত এক বিক্ষোভে তাঁকেও অল্প সময়ের জন্য আটক করা হয়েছিল। ১০ অক্টোবরের সমাবেশের আগের শুক্রবার তাঁর নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি দেয়। তাতে বলা হয়, বর্তমান সরকার ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এক্সে লেখেন, ‘আটক, গ্রেপ্তার, কারাগার, লাঠিপেটা কিংবা ছররা গুলি ভারতের মানুষকে দমাতে পারবে না।’ তাঁর মতে, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় থেকেই তরুণেরা দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রেখে আসছেন।
বিক্ষোভের সময় ছাত্রনেতাদের আটক করে পুলিশ। নয়াদিল্লি, ভারত, ১৩ অক্টোবর ২০২৬দক্ষিণ ভারতেও জোট বিস্তৃত হচ্ছে। চেন্নাইয়ে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ‘গণতন্ত্র রক্ষা’ বিক্ষোভে যোগ দিয়েছে তামিলনাড়ুর ক্ষমতাসীন দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে)। ভোটার তালিকার নানা অনিয়ম ও এসআইআরের বিরুদ্ধে এ কর্মসূচি আয়োজন করেন কংগ্রেসের সংসদ সদস্য বি মানিকাম ঠাকুর ও তামিলনাড়ু কংগ্রেস কমিটি (টিএনসিসি)। ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শরিক সাতটি দলের নেতারা সেখানে অংশ নেন।
৩ অক্টোবর এ জোটে যোগ দেওয়ার পর সিইসিবিরোধী কোনো বিক্ষোভে মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয়ের দলের এটিই প্রথম অংশগ্রহণ। সাউথ ফার্স্টের খবর, কংগ্রেস নেতৃত্বের বরাতে জানা গেছে, বিজেপির বিরুদ্ধে ভবিষ্যতের নানা আলোচনা, প্রচার ও বিক্ষোভে অংশ নিতে বিজয় ও তাঁর দলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন রাহুল।
আন্দোলন সীমানাও পেরিয়েছে। ১৫ অক্টোবর নিউইয়র্কে এশিয়ান আমেরিকান রাইটার্স ওয়ার্কশপের তহবিল সংগ্রহের এক নৈশভোজে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক সালমান রুশদী ভারতের পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, ‘ভারতে একটা ঘটনা ঘটছে বটে। পরিস্থিতি ফুটন্ত অবস্থায় রয়েছে।’
জ্ঞানেশ কুমারকে পদে রাখার পেছনে তাঁর সরে যাওয়ার সম্ভাব্য পরিণতির ভয় কাজ করতে পারে। সরকার চাইলে তাঁকে সরিয়ে অন্য কাউকে বসাতে পারত এবং প্রতিষ্ঠানটির ওপর আস্থা ফেরানোর দাবি করতে পারত। কিন্তু ভার্গবের মতে, সরকার সেই ঝুঁকি নিতে চাইছে না। কারণ, জ্ঞানেশের উত্তরসূরি মোদি সরকারের স্বার্থের প্রতি অনুকূল হবেন কি না, তা নিশ্চিত নয়।ভারতে অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই লেখক। গেরুয়া শিবিরেরও সমালোচনা করেন। উপস্থিত অতিথিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি এমন একটা কথা বলব, যা হয়তো রেস্তোরাঁয় বলা উচিত নয়—ককরোচদের আন্দোলনকে “উদ্যাপন” করুন। ভারতের অল্প বয়স্ক ছেলেমেয়েরা দীর্ঘদিন পর আমাদের মধ্যে একটা আশার আলো জাগিয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের পাশে দাঁড়ান।’
জুলাইয়ের স্মৃতি, সামনের পথ এ আন্দোলনের সঙ্গে ভারতে জুলাই বিক্ষোভের তুলনা টানা হচ্ছে। গ্রীষ্মে গড়ে ওঠা সিজেপি তখন একের পর এক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার (নিটসহ) প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ পরীক্ষা ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রতিবাদে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ করেছিল।
কয়েক সপ্তাহের সেই আন্দোলনের মুখে নয়াদিল্লির প্রধান সড়কগুলো অচল হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে হয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে। ভারতে মন্ত্রীদের পদত্যাগের ঘটনা খুবই বিরল। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এটি ছিল মোদির কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে সবচেয়ে স্পষ্ট চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
ভার্গবের মতে, সে সময় ২০ জুলাই পুলিশের নৃশংস দমন-পীড়নে একটি প্রজন্মের তরুণ ভোটারদের সমর্থন হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। এরপরই সরকার পিছু হটেছিল। এতে বিরোধী নেতাদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগও তৈরি হয়। অপূর্বানন্দ বলেন, তখন ‘তরুণেরা সরকারের আসল চেহারা দেখতে পেয়েছিল’। তাঁর ভাষায়, ‘মানুষের চোখের সামনে বাস্তবতা খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এরপর মানুষ বিরোধীদের কথা শুনতে ও তাদের দেখতে শুরু করে। রাহুল গান্ধীকেও তারা স্পষ্ট বুঝতে শুরু করে।’
দিল্লিতে এক বিক্ষোভে কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা রাহুল গান্ধী ও তাঁর বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রএ আন্দোলনের শক্তির একটি বড় উৎস জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনকারীদের অনানুষ্ঠানিক ও স্বতঃস্ফূর্ত ধরন। ভার্গব বলেন, তরুণ কর্মীরা ব্যঙ্গ, প্রচলিত রীতির বাইরে যাওয়া স্লোগান এবং এমন কিছু কৌশল ব্যবহার করতে পারেন, যা প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো এড়িয়ে চলে। তাঁর মতে, এ আন্দোলন বিরোধীদের কাজের বিকল্প নয়; বরং তাদের আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করছে।
তবে জুলাইয়ের মতো এবার দ্রুত সমাধান আসবে বলে মনে করেন না অপূর্বানন্দ। তাঁর কথায়, ‘এটা চলতে থাকবে। কারণ, এখন লড়াইটা সরকার ও জনগণের মধ্যে।’ জুলাইয়ে সরকার তরুণদের দাবির প্রতি সাড়া দিচ্ছে—এমন ধারণা তৈরি করতে চেয়েছিল। কিন্তু এবারের বিরোধ সামলানো তাদের জন্য কঠিন।
সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে মোদি সম্প্রতি মোদি ও তাঁর দল বিজেপি ক্ষমতায় থাকার ২৫ বছর উদ্যাপন করেছে। ২০০১ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন মোদি। ৭ অক্টোবর তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে টানা ২৫ বছর পূর্ণ করেছেন।
কিন্তু বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদিকে কখনোই এখনকার মতো এত দুর্বল দেখা যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও হার্ডনিউজ ম্যাগাজিনের সম্পাদক সঞ্জয় কাপুর আল-জাজিরাকে বলেন, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষই চান না মোদির বিজেপি ক্ষমতায় থাকুক। মোদি সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটাই কমতে শুরু করেছে বলে তিনি মনে করেন।
সঞ্জয় কাপুরের মতে, ‘বিজেপি ভয় পাচ্ছে যে জনমত দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। পরে ক্ষমতায় ফিরে আসা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।’
বিক্ষোভ এখন আর শুধু ভোটার তালিকার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। মোদি সরকারের আমলে গণতন্ত্র, ভিন্নমত প্রকাশ ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়েও বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ বাস্তবতাই বোধ হয় ব্যাখ্যা করে, একজন কর্মকর্তার পদত্যাগের দাবি কেন এই সরকারের কাছে এত বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্ঞানেশ কুমার সরে গেলে সরকার বিরোধীদের অভিযোগে সায় দিয়েছে বলে ধরা হবে। ভাবমূর্তিতে চিড় ধরবে, আর জ্ঞানেশের উত্তরসূরি কেমন হবেন, তা-ও অনিশ্চিত। অন্যদিকে না সরলে বাড়তে থাকবে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন, রাস্তার বিক্ষোভ। আর তা ঠেকাতে না পারলে, গদিচ্যুতও হওয়া লাগতে পারে মোদিকে।
[তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা, রয়টার্স, ইনডিপেনডেন্ট, হিন্দুস্তান টাইমস ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস]
নির্বাচনে ট্রাম্পের এ সমর্থনের প্রভাব অতিরঞ্জিত করে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন সানাম ভাকিল। তিনি বলেন, নেতানিয়াহুকে নিয়ে ইসরায়েলের ভোটারদের মধ্যে বিভক্তি রয়েছে।
১৭ অক্টোবর প্যারিস, মার্সেই, লিওঁসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক দাঙ্গা ও লুটপাট চলে। এর পরিপ্রেক্ষিতে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।