হোমপেজ লোড হচ্ছে…
সবুজ ঘাস, গাছের পাতার মৃদু শব্দ, বাতাস আর মাটিতে পায়ের স্পর্শ- এগুলো মন ভালো করার আদিম উপকরণ।
নিজস্ব প্রতিবেদক

শহুরে ব্যস্ত জীবন, ল্যাপটপ-মোবাইলের স্ক্রিন আর অনবরত কাজের চাপ মানসিক ক্লান্তি বাড়িয়ে দেয়। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে মন ভালো করার যত রকম উপায় রয়েছে, তার মধ্যে আদি ও অকৃত্রিম উপায় হল প্রকৃতির মাঝে কিছু সময় কাটানো।
সবুজ ঘাসে আর গাছের নিচে কিছুক্ষণ হাঁটলে মন ও শরীর দুই-ই এক অদ্ভুত শান্তিতে ভরে ওঠে।
প্রকৃতি যে আমাদের ভালো রাখে, তা আমরা অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বুঝলেও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন নিঁখুতভাবে প্রমাণ করছে যে, মাটির কাছাকাছি পা রাখলে শরীরের ভেতরে আসলে কী ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে।
মনস্তত্ত্ব-বিষয়ক ওয়েবসাইট সাইকোলজি টুডে-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে, জার্মান প্রবাসী আচরণ-মনোবিদ ও গবেষক ডা. মারিয়ানা পোগোসিয়ান, প্রকৃতির এই জাদুকরী ক্ষমতার নেপথ্যে থাকা বৈজ্ঞানিক কারণগুলো বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
তিনি জানান, প্রকৃতি কীভাবে আমাদের মন ভালো করে, তা বুঝতে বিজ্ঞানীরা প্রধানত তিনটি তত্ত্বের ওপর জোর দিয়ে থাকেন।
অ্যাটেনশন রিস্টোরেশন থিওরি: আধুনিক জীবনের নানান মানসিক চাহিদা মনোযোগের ক্ষমতাকে দ্রুত নিঃশেষ করে দেয়। তবে প্রাকৃতিক পরিবেশে মানুষ এক ধরনের শিথিল ও মৃদু আকর্ষণে সাড়া দেয়, যা ক্ষয়ে যাওয়া মনোযোগের ক্ষমতা, কর্মক্ষমতা এবং স্মৃতিশক্তিকে পুনরায় সতেজ করে তোলে।
স্ট্রেস রিকভারি থিওরি: এই তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রাকৃতিক পরিবেশ মানুষের ‘প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম’ বা স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় করে তোলে, যা শরীরকে বিশ্রাম ও ধকল কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে।
উন্নত প্রযুক্তির নিউরোইমেজিং (যেমন ইইজি এবং এফএমআরআই) গবেষণায় দেখা গেছে, সবুজের মাঝে সময় কাটালে রক্তচাপ, কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোন এবং হৃদস্পন্দন সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে মানসিক চাপ কমিয়ে দেয়।
বায়োফিলিয়া হাইপোথিসিস: মানুষের বিবর্তন ইতিহাসের শুরু থেকেই প্রকৃতির সঙ্গে একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই সবুজের উপস্থিতি খোঁজে, যা তাকে দীর্ঘকাল ধরে টিকে থাকতে এবং মানসিকভাবে প্রফুল্ল থাকতে সাহায্য করে আসছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের সাময়িকী ‘ট্রেন্ডস ইন কগনিটিভ সায়েন্সেস’-এ প্রকাশিত এক পর্যালোচনা পত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটন’-এর পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. গ্রেগরি ব্র্যাটম্যান এবং ‘স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র মনস্তত্ত্ববিদ ড. জেমস গ্রস যৌথভাবে এমন ৫টি সুনির্দিষ্ট পথের কথা উল্লেখ করেছেন, যার মাধ্যমে প্রকৃতি আবেগ ও মানসিক স্বাস্থ্যকে পুষ্ট করে।
আবেগ নিয়ন্ত্রণ
মানুষ কীভাবে ও কখন নিজের আবেগ প্রকাশ বা নিয়ন্ত্রণ করবে, তার পেছনে প্রকৃতির ভূমিকা অনেক।
ড. গ্রসের মতে, “মানুষ অবচেতনভাবেই পার্ক বা জলাশয়ের মতো প্রাকৃতিক পরিবেশ বেছে নেয়, কারণ সেখানে ইতিবাচক আবেগের জন্ম হয়। এছাড়াও সবুজের সান্নিধ্য মনের ভেতরের অনবরত নেতিবাচক চিন্তা বা একই বিষয় নিয়ে বারবার ভাবার বাজে অভ্যাসকে দূর করতে সাহায্য করে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার স্নায়ুবিক উন্নয়ন
মনের আবেগ যে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তা এখন প্রমাণিত। গাছপালা থেকে 'ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড' বা এক ধরনের উদ্বায়ী জৈব যৌগ বাতাসে নিঃসৃত হয়।
বনের এই নির্মল বাতাস ফুসফুসে নেওয়ার ফলে তা শরীরে প্রদাহবিরোধী হিসেবে কাজ করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতির সংস্পর্শে এলে রক্তে ইন্টারলিউকিন-৬-এর মতো ক্ষতিকর অণু কমে যায় এবং রোগ প্রতিরোধকারী ‘হোয়াইট ব্লাড সেল’ বা 'ন্যাচারাল কিলার সেল' বৃদ্ধি পায়, যা শরীরকে ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
হিউম্যান মাইক্রোবায়োম বা অণুজীবের ভারসাম্য
পরিপাকতন্ত্রে থাকা কোটি কোটি উপকারী ব্যাকটেরিয়া বা মাইক্রোবায়োম হরমোন এবং স্নায়ুতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করে, যার প্রভাব সরাসরি মেজাজের ওপর পড়ে।
মাটিতে হাত দেওয়া, কাদা-মাটি মাখা বা বনের বাতাসে শ্বাস নেওয়ার ফলে এই উপকারী অণুজীবের বৈচিত্র্য বহুগুণ বাড়ে।
ফিনল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব হেলসিঙ্কির গবেষকদের পরিচালিত দুই বছর ধরে করা গবেষণায় দেখা গেছে, যে শিশুদের খেলার মাঠে ঘাস, লতাগুল্ম ও মাটির মতো প্রাকৃতিক উপাদান বেশি ছিল, তাদের ত্বকে উপকারী অণুজীবের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
গভীর ও প্রশান্তিময় ঘুম
ঘুমের সঙ্গে ভালো থাকার সম্পর্ক সরাসরি যুক্ত। প্রকৃতির নির্মল পরিবেশ ঘুমের জন্য চমৎকার প্রাকৃতিক নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
যারা সবুজ গাছপালা পরিবেষ্টিত এলাকায় বাস করেন বা নিয়মিত পার্কে হাঁটেন, তাদের ঘুমের মান এবং সময়কাল দুটোই শহরের যান্ত্রিক কোলাহলে থাকা মানুষের চেয়ে অনেক উন্নত হয়।
শারীরিক সক্রিয়তা বৃদ্ধি
প্রকৃতি অলসতা দূর করে শারীরিকভাবে সক্রিয় হতে উৎসাহিত করে। একটি সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে হাঁটাচলা বা ব্যায়ামের ভেতরের একঘেয়েমি দূর করে শরীরচর্চাকে অনেক বেশি আনন্দদায়ক করে তোলে।
ফলে নিয়মিত হাঁটার মাধ্যমে ইতিবাচক মানসিক অবস্থার উন্নতি ঘটে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষ ও প্রকৃতির এই মেলবন্ধনের নেপথ্যে আরও অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে যা নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।
তবে যান্ত্রিক শহরের কৃত্রিমতা ছেড়ে সপ্তাহে অন্তত কয়েকটা দিন সবুজের কাছাকাছি যাওয়া মানসিক সুস্থতার জন্য জরুরি।
মন খারাপ করা ‘কনটেন্ট’ বাড়ায় মানসিক ক্লান্তি মন খারাপ! একটু হেঁটে আসুন মানসিকতা উন্নত করার পন্থা