হোমপেজ লোড হচ্ছে…
যে প্রবাসীদের আয়ে দেশের অর্থনীতি সচল থাকে, সংকটের দিনে ন্যূনতম আইনি সহায়তা না দিয়ে রাষ্ট্র কি নিজের প্রাথমিক দায়িত্ব এড়াতে পারে?
পারভেজ আলম

বিদেশের মাটিতে বিচারের মুখোমুখি হয়ে দেশের দুই জন নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেল, আর তাদের নিজ দেশের অভিভাবক দূতাবাস থাকল পুরো অন্ধকারে—একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় প্রশাসনিক ব্যর্থতা আর কী হতে পারে? গত ১৪ অক্টোবর মক্কায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তরুণ ও টাঙ্গাইলের এক তরুণীর জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের কনস্যুলার সুরক্ষার কঙ্কালসার চেহারাটি আবারও উন্মোচিত হলো।
নিজের দেশের মানুষের মৃত্যুদণ্ডের খবর যদি বিদেশের কোনো সরকারি বিবৃতি দেখে জানতে হয়, তবে আর কী বলার থাকে? খবরটি দেশের সংবাদমাধ্যমে আসার পর থেকেই সচেতন নাগরিকদের মনে একের পর এক গভীর প্রশ্ন উঠছে। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কাজের দায়ে তাদের এই চরম সাজা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ধাক্কা এলো অন্য জায়গা থেকে—আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা জেদ্দার কনস্যুলেটের কেউই মৃত্যুদণ্ড বাস্তবায়নের আগপর্যন্ত এর কিছুই জানত না। বিদেশের মাটিতে দুজন মানুষ বিচারে সোপর্দ হলেন, সাজা পেলেন এবং তা বাস্তবায়নও হয়ে গেল; অথচ তাদের অভিভাবক হিসেবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি থাকল পুরো অন্ধকারে। এটি সাধারণ কোনো কূটনৈতিক ভুল নয়, আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার চরম উদাসীনতার এক স্পষ্ট প্রমাণ।
সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রতিবেদন পর্যালোচনায় উঠে এসেছে এই ঘটনার ভেতরের নানা অসংগতি ও ধোঁয়াশা। ৩০ সেপ্টেম্বর জেদ্দা কনস্যুলেট আটক বাংলাদেশিদের যে তালিকা পেয়েছিল, সেখানে এই দুজনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি অভিযোগের উল্লেখ ছিল—তরুণটির বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ এবং তরুণীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের। কিন্তু সেই নথিতে মৃত্যুদণ্ডের কোনো তথ্য বা আগাম সতর্কবার্তা ছিল না। পরবর্তীতে দুটি ভিন্ন অভিযোগ কীভাবে যৌথভাবে একই মসজিদের ঘটনার অংশ হয়ে চরম সাজায় পরিণত হলো, সেই আইনি রহস্যের কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি। তবে মূল প্রশ্নটি এখানেই জোরালো হয়ে ওঠে: তালিকায় তাদের নাম ও অভিযোগ দেখার পরও বন্দিদের প্রকৃত আইনি অবস্থা খতিয়ে দেখতে আমাদের কূটনৈতিক মিশন ঠিক কী পদক্ষেপ নিয়েছিল?
এই দুই প্রবাসীর জীবনসংগ্রামের দিকে তাকালে আমাদের অর্থনীতিকে সচল রাখা রেমিটেন্সের পেছনের নির্মম চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জীবিকার তাগিদ আর পরিবারের দারিদ্র্য ঘোচাতে ঋণের টাকায় তরুণটি সৌদি আরবে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ নিয়েছিলেন। তরুণীটিও একই আশায় দেশ ছেড়েছিলেন নিজের পরিবারের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়ার জন্য।
গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ সময় সৌদি কারাগারে কাটলেও তরুণটি মৃত্যুর মাত্র তিন দিন আগে যখন বাড়িতে মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন, তখনও তিনি জানতেন না যে তার জীবনের শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে। তরুণীটিও পরিবারের কাছে আশা প্রকাশ করেছিলেন যে কর্মস্থলের জটিলতা মিটিয়ে তিনি শিগগিরই দেশে ফিরে আসবেন। অথচ মুহূর্তের মধ্যে তাদের নিথর জীবনের খবর পৌঁছাল শোকস্তব্ধ স্বজনদের কাছে। প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রেমিটেন্স এলে ব্যাংকের হিসাবের খাতায় অর্জনের সংখ্যা যোগ হয়। কিন্তু সেই অর্জনের আড়ালে যে রক্ত, ঘাম, স্বজন হারানোর বেদনা এবং জীবনঝুঁকি লুকিয়ে থাকে, রাষ্ট্রীয় ভাবনায় কি তা সত্যিই মর্যাদা পায়?
প্রকাশিত খবর থেকে দেখা যাচ্ছে, বিদেশের মাটিতে বিচারটি চলেছে একেবারে গোপনে। এই দুই প্রবাসীর পক্ষে লড়তে কোনো স্বাধীন আইনজীবী ছিলেন কি না, তা জানা যায়নি। আদালতের আরবি ভাষা বোঝার মতো কোনো নিরপেক্ষ দোভাষী দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়। এমনকি স্বজনদেরও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কিছু জানানো হয়নি। সৌদি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'তাআজির' বা বিচারকের নিজস্ব বিবেচনায় এই দণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই বিধানে সাজা নির্ধারণে বিচারকের মতামতই প্রধান থাকে। তবে এই মামলায় বিকল্প সাজা, আপিল বা ক্ষমার কী সুযোগ ছিল, তা জানতে আদালতের নথি দেখা দরকার। কিন্তু মিশন থেকে শুরুতেই খবরাখবর না নেওয়া এবং আইনি তদারকি না থাকায় সেই পথগুলো শুরুতেই বন্ধ হয়ে গেছে।
আইনি দিক থেকে ভাবলে, রাষ্ট্রের কাজ কি কেবল প্রবাসে কর্মী পাঠানো আর ডলার গোনা? কোনো নাগরিক বিদেশে গ্রেপ্তার বা আইনি জটিলতায় পড়লেই তার প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুরু হয়ে যায়। কফিনে মোড়ানো লাশ বিমানবন্দরে নামার পর শোক প্রকাশ করা মূল কাজ হতে পারে না। ১৯৬৩ সালের ভিয়েনা কনস্যুলার সনদের ৩৬ অনুচ্ছেদে গ্রেপ্তার হওয়া নাগরিকের নিজ কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার দেওয়া আছে। তবে এই আন্তর্জাতিক সনদ নিজে থেকে সমাধান তৈরি করে না। রাষ্ট্র সময়মতো কূটনৈতিক তৎপরতা না চালালে আন্তর্জাতিক আইনের এই অধিকার কেবল কাগজে-কলমে রয়ে যায়। আমাদের মিশন কি এই অধিকার নিশ্চিত করতে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে সময়মতো কোনো জোরালো বার্তা পাঠাতে পেরেছিল?
পত্রপত্রিকায় এই খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকের মধ্যে প্রবাসী শ্রমিকদের ব্যক্তিগত জীবন বা পাপ-পুণ্য নিয়ে কটু মন্তব্য করার একধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। প্রবাসে চরম একাকীত্ব ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে দিন কাটানো মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের ভুলত্রুটি বা নৈতিকতা নিয়ে সমাজের বিচারকের আসনে বসা খুবই সহজ। কিন্তু সাধারণ মানুষের এই নৈতিক আলোচনার সঙ্গে রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট দায়িত্বের জায়গাটি গুলিয়ে ফেলা চলবে না। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একজন নাগরিক যে অপরাধেই অভিযুক্ত হন না কেন, বিদেশের মাটিতে তার কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার এবং ন্যায্য বিচার পাওয়ার সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। রাষ্ট্র নিজের প্রশাসনিক গাফিলতি আড়াল করতে প্রবাসীদের ব্যক্তিগত চালচলনের দোহাই দিতে পারে না।
বিশ্বের অন্যান্য শ্রম রপ্তানিকারক দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ২০১১ সালে সৌদি আরবে একজন ইন্দোনেশীয় গৃহকর্মীর ফাঁসির পর জাকার্তা অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেয় এবং নিজ নাগরিকদের বাঁচাতে কোটি কোটি টাকা ব্লাড মানি বা রক্তপণ দেওয়ার নজির তৈরি করে। ফিলিপাইন শক্ত দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে প্রবাসীদের জন্য আইনি সুরক্ষা ও জরুরি হেল্পলাইনের নিশ্চয়তা আদায় করে নিয়েছে। শ্রীলঙ্কা সরকারও তাদের নাগরিকদের জন্য সরকারি খরচে আইনি লড়াই চালিয়ে সৌদি সুপ্রিম কোর্ট থেকে মৃত্যুদণ্ড বাতিলের সাফল্য পেয়েছে। অথচ আমরা বছরের পর বছর শ্রমবাজার টিকিয়ে রাখার অজুহাতে প্রবাসীদের সুরক্ষার মূল দাবিগুলোকে আড়ালে ঠেলে দিয়েছি।
আমাদের সমাজে একটা সামাজিক কুসংস্কার (Social Stigma) আছে—'নারী শ্রমবাজার বন্ধ করে দাও'। সৌদি আরবের এই ঘটনার পরে সেই দাবিটি আরও জোরালো হয়েছে। নেপালের অভিজ্ঞতা থেকেও এখানে শেখার মতো অনেক কিছু আছে আমাদের। ২০১৭ সালে দেশটি উপসাগরীয় অঞ্চলে নারী গৃহকর্মী পাঠানো এক আদেশে বন্ধ করে দেয়। ভেবেছিল, এতে প্রবাসে নারীদের সুরক্ষা মিলবে। কিন্তু দেশের আর্থিক সংকট আর কাজের অভাব থাকায় নারীদের বিদেশে যাওয়া থামানো যায়নি। তারা অন্য দেশ হয়ে অবৈধ পথে প্রবাসে পাড়ি জমাতে শুরু করেন। এতে মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ার ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে গেল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও হুট করে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। আসল কাজ হলো প্রতিটি দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করা; প্রবাসে যাওয়ার আগে সঠিক প্রশিক্ষণ দেওয়া, বিপদে দূতাবাসের দুয়ার খোলা রাখা এবং স্থায়ী আইনি নজরদারি জোরদার করা।
বিদেশের মিশনগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি ও কাজের ধারায় এখন জরুরি পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। প্রবাসীদের কনস্যুলার সেবাকে কেবল জরুরি মুহূর্তে দেশে ফেরার টিকিট কেটে দেওয়া বা পাসপোর্ট নবায়নের রুটিন কাজের মধ্যে আটকে রাখলে চলবে না। বিদেশের কারাগারে আটক যেকোনো বাংলাদেশির জন্য গ্রেপ্তারের প্রথম দিন থেকেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ, সরকারি খরচে আইনজীবী নিয়োগ, আদালতের নথি সংগ্রহ, আপিল দায়ের করা এবং প্রয়োজনবোধে ক্ষমার চেষ্টা চালানোই প্রবাসে নাগরিক সুরক্ষার মূল কাজ।
এই ঘটনার পর সৌদি সরকারের কাছ থেকে কয়েকটি বিষয় আনুষ্ঠানিকভাবে পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। শুরুতেই এই দুই প্রবাসীর গ্রেপ্তারের বিবরণ, অভিযোগপত্র, আদালতের রায়সহ পুরো বিচারপ্রক্রিয়ার অনুলিপি চাওয়া উচিত। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো বাংলাদেশি গুরুতর মামলায় অভিযুক্ত হলে দূতাবাসকে যেন আগেভাগেই জানানো হয়, সেই নিয়মও চুক্তি করে নিশ্চিত করা দরকার। শুধু সৌদিতেই নয়, প্রতিটি প্রবাসীবাজারের দূতাবাসে নিজস্ব অনুবাদক, আইনি সহায়তা সেল এবং ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন চালু রাখা জরুরি। একই সঙ্গে প্রবাসে আটক নাগরিকদের নিয়মিত দেখতে যাওয়া আর দেশে স্বজনদের কাছে খবরাখবর পৌঁছানোর একটা নিয়ম থাকা দরকার। আর বছরজুড়ে আটক বাংলাদেশিদের আইনি সুরক্ষায় দূতাবাসগুলো কী ভূমিকা রাখছে, তার একটি বার্ষিক হিসাবও জনগণের সামনে খোলাসা করা উচিত।
রেমিটেন্সের ওপর ভর করে দেশের অর্থনীতি সচল থাকলেও বিপদের দিনে প্রবাসীরা কোনো আইনি আশ্রয় পান না। মক্কার এই মৃত্যুদণ্ড তাই কেবল দুজনের সাজা নয়; এটি প্রবাসে নাগরিকদের আইনি নিরাপত্তা দিতে আমাদের দূতাবাসের ব্যর্থতার স্মারক। যে প্রবাসীদের উপার্জনে দেশ চলে, সংকটে পড়লে তাদের অন্তত ন্যূনতম আইনি সহায়তা দেওয়াটা রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব। বিদেশের মাটিতে নাগরিকের জীবন ও বিচার সুরক্ষার এই প্রাথমিক কর্তব্য রাষ্ট্র আর কোনো দোহাই দিয়ে এড়াতে পারে না।
পারভেজ আলম: মানবাধিকারকর্মী ও সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষক। ই-মেইল: parvezscse@gmail.com
যে প্রবাসীদের আয়ে দেশের অর্থনীতি সচল থাকে, সংকটের দিনে ন্যূনতম আইনি সহায়তা না দিয়ে রাষ্ট্র কি নিজের প্রাথমিক দায়িত্ব এড়াতে পারে?
যে প্রবাসীদের আয়ে দেশের অর্থনীতি সচল থাকে, সংকটের দিনে ন্যূনতম আইনি সহায়তা না দিয়ে রাষ্ট্র কি নিজের প্রাথমিক দায়িত্ব এড়াতে পারে?
যে প্রবাসীদের আয়ে দেশের অর্থনীতি সচল থাকে, সংকটের দিনে ন্যূনতম আইনি সহায়তা না দিয়ে রাষ্ট্র কি নিজের প্রাথমিক দায়িত্ব এড়াতে পারে?
যে প্রবাসীদের আয়ে দেশের অর্থনীতি সচল থাকে, সংকটের দিনে ন্যূনতম আইনি সহায়তা না দিয়ে রাষ্ট্র কি নিজের প্রাথমিক দায়িত্ব এড়াতে পারে?