হোমপেজ লোড হচ্ছে…

বাংলাদেশে এখন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আগের মতো খুব একটা চোখে পড়ে না। কিন্তু বাস্তবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের যে নীরব কর্মসূচি চলছে, তা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কার্যকর! পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরকে আলাদা করে প্রচার চালাতে হচ্ছে না, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণে ঘরে ঘরে যেতে হচ্ছে না, ছোট পরিবার গড়ার পরামর্শও দিতে হচ্ছে না। মানুষ মরছে, আর জনসংখ্যা কমানোর কাজটি এগিয়ে চলছে আপন গতিতে। কেউ মরছে সড়কে, কেউ গুলিতে, কেউ ডেঙ্গুতে, কেউ হামে, কেউ চিকিৎসার অভাবে। কেউ মরছে অগ্নিকাণ্ডে, কর্মস্থলে কিংবা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে। মৃত্যুর কারণ আবিষ্কারে আমাদের যেন অসাধারণ সৃজনশীলতা; শুধু মৃত্যু ঠেকানোর কার্যকর উপায় আবিষ্কারেই যত অনীহা! মনে হয়, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আর নতুন প্রকল্প নিতে হবে না। প্রকৃতিই দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে, আর প্রশাসন বসে বসে সাফল্যের হিসাব কষছে!
ডেঙ্গুর কথাই ধরা যাক। এক দিনে ১৩ জনের মৃত্যুর খবরও এখন সংবাদজগতের পরিচিত উপাদান। আজ ১৩ জন, কাল হয়তো আরও বেশি। কারও সন্তান অনাথ হচ্ছে, কারও সংসারের উপার্জনক্ষম মানুষটি হারিয়ে যাচ্ছে, কারও মায়ের বুক খালি হচ্ছে। কিন্তু চারপাশের নির্বিকার ভাব দেখে মনে হয়, বর্ষাকালে বৃষ্টি হওয়ার মতো ডেঙ্গুতে মানুষের মৃত্যুও বুঝি প্রাকৃতিক নিয়ম। পার্থক্য শুধু, বৃষ্টির জন্য ছাতা লাগে, আর ডেঙ্গুর জন্য লাগে সরকারি বিবৃতি। বিবৃতি অবশ্য মশা কামড়ায় না, তাই তার কার্যকারিতা নিয়ে কোনো অভিযোগও নেই।
চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি সেই পুরোনো ব্যর্থতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ২৬ হাজার ছাড়িয়েছে, মৃত্যুও চার শতাধিক। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অক্টোবর শেষ হওয়ার আগেই রোগীর সংখ্যা গত বছরের পুরো হিসাব অতিক্রম করেছে। ২০২৩ সালে ডেঙ্গু কেড়ে নিয়েছিল ১ হাজার ৭০৫টি প্রাণ। এত বড় বিপর্যয়ের পরও ২০২৬ সালে এসে প্রশ্ন করতে হচ্ছে, আমরা শিখলাম কী? নাকি আমাদের প্রশাসনিক স্মৃতিশক্তি মশার আয়ুর চেয়েও কম? বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ছিল, ঝুঁকির খবর ছিল, লার্ভার উপস্থিতি বাড়ার তথ্যও ছিল। কিন্তু আগাম সতর্কতাকে আমরা এমনভাবে গ্রহণ করি, যেন কেউ বিনা আমন্ত্রণে অনুষ্ঠানে এসে বক্তৃতা দিয়ে গেছে—শুনলাম, মাথা নাড়লাম, তারপর যে যার কাজে ফিরে গেলাম।
ডেঙ্গুর কারণ আমাদের অজানা নয়। কোথায় মশা জন্মায়, কীভাবে বংশবিস্তার করে, কীভাবে রোগ ছড়ায়—এসব নিয়ে গবেষণা হয়েছে, সভা হয়েছে, সেমিনার হয়েছে, নির্দেশিকা তৈরি হয়েছে, বাজেটও খরচ হয়েছে। শুধু কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থাটিই যেন বারবার অনুপস্থিত থাকে, ছুটি নেয়। নর্দমায় পানি জমে, নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমে, ছাদে পরিত্যক্ত পাত্র পড়ে থাকে। মশার বংশবিস্তার চলে নিরবচ্ছিন্নভাবে, আর কর্তৃপক্ষের তৎপরতা বাড়ে রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হওয়ার পর। অর্থাৎ মশা আগে কাজ শুরু করে, প্রশাসন পরে উদ্বোধনী প্রস্তুতি নেয়।
নগর কর্তৃপক্ষের যুক্তি, নাগরিকেরা সহযোগিতা করছেন না। কথাটা পুরোপুরি অমূলক নয়। বাড়ির ছাদ, বেজমেন্ট, ফুলের টব কিংবা পরিত্যক্ত পাত্রে পানি জমতে দেওয়া নাগরিক দায়িত্বহীনতা। এইডিস মশা যে কেবল সিটি করপোরেশনের গুদামে বংশবিস্তার করে না, তা বুঝতে কীটতত্ত্বে পিএইচডি লাগে না। কিন্তু নাগরিকের ঘাড়ে দায় চাপালেই কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ? তাহলে মশা নিয়ন্ত্রণে বাজেট, জনবল, কীটনাশক, জরিপ ও নগর ব্যবস্থাপনার এত আয়োজন কেন? নাগরিকের দায়িত্ব নিজের বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব পুরো শহরটিকে মশার অভয়ারণ্য হতে না দেওয়া। দুপক্ষের দায়িত্ব আলাদা, কিন্তু ব্যর্থতার অজুহাত হিসেবে দুপক্ষই যেন একে অন্যকে দত্তক নিতে প্রস্তুত।
মশা মারার ওষুধ ছিটানোর দৃশ্যও বড় মনোরম। ফগার মেশিন থেকে ধোঁয়া বেরোয়, রাস্তা ঢেকে যায়, মানুষ ভাবে অভিযান চলছে। এক কর্মকর্তা যথার্থই বলেছেন, ধোঁয়া না দেখলে মানুষ মনে করে কাজ হচ্ছে না। কিন্তু ধোঁয়া আর কার্যকারিতা যে এক জিনিস নয়, এই সামান্য সত্যটি বুঝতে এত আয়োজন কেন? শহর ধোঁয়ায় ভরে উঠলেই যদি মশা নির্মূল হতো, তাহলে শিল্পাঞ্চলের বাতাসেই এত দিনে ডেঙ্গুর কবর রচিত হতো। আসল কাজ লার্ভা ধ্বংস, প্রজননস্থল শনাক্ত, কার্যকর ওষুধ প্রয়োগ, নিয়মিত নজরদারি এবং ফলাফল যাচাই। লোকদেখানো অভিযানের সুবিধা—ছবি তোলা যায়; অসুবিধা—ছবিতে মশার মৃত্যু দেখা যায় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এইডিস মশার আচরণ বুঝে লক্ষ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ দরকার। কিন্তু আমাদের ব্যবস্থা অনেকটা মশার সঙ্গে দাবা খেলতে বসে তাকে লুডুর নিয়ম বোঝানোর মতো। প্রয়োজন সারা বছর নজরদারি, এলাকাভিত্তিক জরিপ, সমন্বিত বিশেষজ্ঞ দল এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর জবাবদিহি। অথচ আমাদের তৎপরতা মৌসুমি ফলের মতো—বর্ষায় বাজারে আসে, বর্ষা শেষ হলে উধাও। মশার অবশ্য সরকারি ছুটি নেই, অভিযান শেষ হওয়ার তারিখ নেই, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য অপেক্ষাও নেই। সে সরকারি নির্দেশনার তোয়াক্কা না করেই বংশবিস্তার করে।
ডেঙ্গুর পাশাপাশি হামের উদ্বেগও জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনেছে। বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, এ বছর হামের উপসর্গ নিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসা নিয়েছে, শিশুমৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগজনক। টিকাদানের পরও প্রত্যাশিত সুরক্ষা না পাওয়ার বিষয়ে গবেষণা থাকলে টিকার কার্যকারিতা, সংরক্ষণব্যবস্থা ও টিকাদানের আওতা যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। তবে কোনো গবেষণার ফলকে অতিরঞ্জিত না করে তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই উচিত। কারণ ডেঙ্গু হোক বা হাম, প্রতিরোধযোগ্য রোগে সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ, বিশেষত শিশুরা। বড়দের ব্যর্থতার হিসাব ছোটদের জীবন দিয়ে মেটানোর নাম নিশ্চয়ই উন্নয়ন নয়।
প্রশ্ন হলো, এত প্রতিষ্ঠান, কর্মকর্তা, সভা, বাজেট ও প্রচারাভিযানের পরও প্রতিরোধব্যবস্থা কেন বারবার পিছিয়ে পড়ে? সরকার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালায়, মাইকিং করে, লিফলেট বিলি করে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের ঘোষণা দেয়। এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু কর্মসূচির উদ্বোধন আর সাফল্য এক নয়। ফিতা কাটার সময় ক্যামেরা থাকে, অথচ অভিযান শেষে কতটি প্রজননস্থল ধ্বংস হলো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণ কতটা কমল, কত মানুষের জীবন রক্ষা পেল—তার হিসাব কোথায়? প্রশাসনিক সাফল্য যদি শুধু সভার সংখ্যা, প্রচারের আওতা আর ব্যয়ের অঙ্কে মাপা হয়, তাহলে ব্যর্থতাও খুব সহজে সাফল্যের পোশাক পরে মঞ্চে উঠে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের উচিত বাংলাদেশের জন্য বিশেষ স্বীকৃতির কথা বিবেচনা করা। পুরস্কারের নাম হতে পারে—‘জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অনিচ্ছাকৃত অবদান’। তবে সঙ্গে একটি শর্ত থাকবে: পুরস্কার গ্রহণের আগে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে, কত মানুষের মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল, অথচ করা হয়নি। অবশ্য পুরস্কারটি ব্যঙ্গের বিষয়, বাস্তব কোনো সাফল্যের দাবি নয়। কারণ রাষ্ট্রের সাফল্য কত মানুষকে পৃথিবীতে আসতে নিরুৎসাহিত করা গেল, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় কত মানুষকে নিরাপদে বাঁচিয়ে রাখা গেল, কত শিশুকে অনাথ হওয়া থেকে রক্ষা করা গেল, কত পরিবারকে প্রিয়জন হারানোর শোক থেকে বাঁচানো গেল, তার ভিত্তিতে।
মানুষের জন্মের হিসাব রাখে যে রাষ্ট্র, মৃত্যুর কারণ খুঁজে বের করার দায়িত্বও তার। কারণ জানা থাকলে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে হবে, ব্যর্থ হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকের অসচেতনতা প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার চিরস্থায়ী লাইসেন্স হতে পারে না। একইভাবে সরকারি ব্যর্থতার দোহাই দিয়ে নাগরিকের দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। প্রয়োজন দায়িত্বের স্পষ্ট বণ্টন, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল এবং ফলাফল প্রকাশের বাধ্যবাধকতা। জনস্বাস্থ্য কোনো বক্তৃতার বিষয় নয়, মানুষের বেঁচে থাকার প্রশ্ন।
কথা তো অনেক হলো—সতর্কবার্তা, সভা, অভিযান, মাইকিং, লিফলেট আর আশ্বাস। এবার কাজের কাজ কিছু হোক। মশা ও ভাইরাসকে সংবাদ সম্মেলন দিয়ে থামানো যায় না, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ফিতা দিয়েও তাদের পথ আটকানো যায় না। রাষ্ট্রের কাছে মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়: মানুষ যেন অকারণে না মরে, শিশুরা যেন প্রতিরোধযোগ্য রোগে প্রাণ না হারায়। এই সামান্য প্রত্যাশাটুকু পূরণ করাই যদি কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে উন্নয়ন আর সাফল্যের ঢাকঢোল পিটিয়ে লাভ কী? জনসংখ্যা কমানোর অনিচ্ছাকৃত কর্মসূচিতে আমাদের কথিত সাফল্য যতই বাড়ুক, মানুষের জীবন রক্ষায় ব্যর্থতার দায় তাতে একটুও কমবে না। মশা মারার ধোঁয়া নয়, চাই মশা নিয়ন্ত্রণের ফল; আশ্বাসের বাণী নয়, চাই জীবন রক্ষার প্রমাণ। নইলে একদিন সত্যিই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জনের তালিকায় লেখা থাকবে—কত মানুষকে বাঁচানো যেত, কিন্তু বাঁচানো হয়নি!
চিররঞ্জন সরকার: লেখক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: chiros234@gmail.com
ব্যালটে স্বৈরাচারকে হঠানো সহজ হলেও আন্দোলনের ঐক্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা কঠিন। সার্বিয়া ও ব্রাজিলের বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য জরুরি সতর্কবার্তা।
ব্যালটে স্বৈরাচারকে হঠানো সহজ হলেও আন্দোলনের ঐক্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা কঠিন। সার্বিয়া ও ব্রাজিলের বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য জরুরি সতর্কবার্তা।
ডেঙ্গু, হাম আর প্রশাসনিক ব্যর্থতায় মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হলেও দায়ভার চাপানো হচ্ছে নাগরিকদের ঘাড়ে; মশা মারার লোকদেখানো ধোঁয়া নয়,প্রয়োজন কার্যকর জবাবদিহি ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিরোধ।
একদিকে আকাশচুম্বী বাড়িভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম, অন্যদিকে ভূরাজনীতি ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বোঝা—ইউরোপের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কি তবে ভেঙে পড়ছে?