হোমপেজ লোড হচ্ছে…
সড়ক দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ আদায় কোনো সমাধান নয়; বরং তাৎক্ষণিক চিকিৎসা ও দুর্ঘটনা রোধে কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব।
মো. বাহাউদ্দিন আল ইমরান

সড়কে দুর্ঘটনার খবর এখন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। কখনো সংবাদের প্রধান শিরোনাম, আবার কখনো দিনের শত সংবাদের ভিড়ে ছোট্ট কলামে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে—সড়ক দুর্ঘটনার কোনো খবর নেই, এমন দিন যেন দুর্লভ। প্রতিদিন ঘটে যাওয়া এমন শত শত ঘটনা কি আসলেই ‘দুর্ঘটনা’ নাকি ‘হত্যা’—তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তবে প্রশ্ন যেভাবেই আসুক, সড়কে যাত্রী নিরাপত্তা আজীবন অবহেলার বিষয় হয়েই থেকে যাচ্ছে। ফলে বছরের পর বছর অকাতরে প্রাণহানি ঘটছে, আর ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ আদায় করে দেওয়ার চূড়ান্ত দায় এসে বর্তাচ্ছে আদালতের কাঁধে।
নাগরিক অধিকারের জায়গা থেকে আজ এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই—সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রাথমিক দায়িত্ব যাদের হাতে, তারা কি আদৌ কার্যকরভাবে সে দায়িত্ব পালন করছেন? কোনো একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটার পর তার প্রকৃত কারণ দ্রুত তদন্ত করে জনসম্মুখে প্রকাশ করার নূন্যতম দায়বদ্ধতাটুকুও কি আমরা দেখতে পাই?
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে চালক এবং যানবাহনের লাইসেন্স নবায়নের সময় যে তাৎক্ষণিক জরিমানার নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয়, তা কেবলই প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নাকি আসলে কোনো সমাধান আনছে—সে প্রশ্ন তোলা জরুরি। একইভাবে, মালিকপক্ষ জেনে-বুঝে যান্ত্রিক ত্রুটিযুক্ত যানবাহন সড়কে নামানোর পর যে বীভৎস দুর্ঘটনা ঘটে, তার সমুদয় দায় কেবল সাধারণ চালকের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া মোটেও যৌক্তিক হতে পারে না। চটকদার বিজ্ঞাপনের ব্যানারে যাত্রীসেবার যে অমূল্য প্রতিশ্রুতি ঝুলে থাকে, দুর্ঘটনাকবলিত ও ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের বিপদের দিনে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না; অথচ এ দায় স্পষ্টতই মালিকপক্ষের।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৫২ ও ৫৩ ধারাবলে যাত্রীদের ক্ষতিপূরণ ও আর্থিক সহায়তার জন্য তহবিল কাঠামোর কথা নির্ধারিত রয়েছে। আবার সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২ কার্যকরের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তার পরিবারের পক্ষে আবেদনের মাধ্যমে এই অর্থপ্রাপ্তির সুযোগ রয়েছে। এতে গুরুতর আহত ব্যক্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩ লাখ এবং মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা প্রাপ্তির বিষয়ে আইনে বলা হয়েছে। কিন্তু এখানেই কি শেষ হচ্ছে রাষ্ট্রের সকল দায়? সে কারণেই গুরুতর আহত ব্যক্তির অবশিষ্ট জীবনের চিকিৎসা ব্যয় ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার নিশ্চয়তা দিতে ৩ লাখ টাকা কিংবা প্রয়াত কর্মক্ষম ব্যক্তির জন্য ৫ লাখ টাকায় সব দায় মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা উপহাসের মতোই শোনায়।
দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির চিকিৎসা অবিলম্বে প্রয়োজন হতে পারে। আবার পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি মারা গেলে পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের অক্ষমতাও দেখা দিতে পারে। তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজন হয়ে ওঠে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা। এখানে ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সময়টিও বিবেচনাযোগ্য হয়ে ওঠে। কয়েক বছর পর পাওয়া অর্থ এবং চিকিৎসা—বা জীবিকা নির্বাহের সংকটের মুহূর্তে পাওয়া অর্থের কার্যকর মূল্য কখনোই এক নয়।
প্রচলিত আইনে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণের বিধান অনুপস্থিত থাকায় বিচারপ্রার্থীরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন। রাষ্ট্র তথা দেশের শাসনব্যবস্থা যেখানে ব্যর্থ, সেখানে বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। এরপরও রাষ্ট্র তাদের ব্যর্থতা কতটা ঘোচাতে পেরেছে, তা নিয়ে রাষ্ট্রের জবাবদিহির বিষয়টি বর্তমান থেকে যায়। রাষ্ট্র কি নিজেদের দায় স্বীকার করে ঘটনার পুনরাবৃত্তি বদলাতে বা সংখ্যার পার্থক্য তৈরি করতে পেরেছে? এর উত্তর সকলের জানা। তাই এসব বিষয়ে রাষ্ট্রকেই ভাবতে হবে। কেননা, সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম ও সম্পত্তির সুরক্ষার নীতিটি গ্রহণ করেছে। তাই আমরা স্পষ্টতই এখানে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার দায়কে সামনে আনছি।
সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ চেয়ে করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলাটি ছিল চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীরের মৃত্যুকে ঘিরে। ক্ষতিপূরণের আশায় তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে দেশের অধস্তন আদালতে দেওয়ানি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। যা পরবর্তীতে বদলি করে উচ্চ আদালতে আনা হয়। ২০১৭ সালে উচ্চ আদালতের রায়ের পর মামলাটি আপিল বিভাগে বিচারের জন্য অপেক্ষমাণ থেকে যায়। এরপর থেকে আর গতি পায়নি বহুল আলোচিত এই মামলাটি। বহুল আলোচনায় থাকা আরেকটি মামলা ছিল রাসেল সরকারের। গ্রীন লাইন পরিবহনের ধাক্কায় পা হারানো রাসেলকে প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন হাই কোর্ট। ক্ষতিপূরণের পুরো টাকা না পেলেও শেষ পর্যন্ত মামলাটি আপিল বিভাগ পর্যন্ত গড়িয়েছিল। আর এসব মামলাকে কেন্দ্র করে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের অধিকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে বারবার সামনে এনেছেন আদালত।
দীর্ঘদিন মামলা নিয়ে লেগে থাকা, আদালতের কার্যকর হস্তক্ষেপ ও সংবাদমাধ্যমের ফলোআপের সুবাদে সড়ক দুর্ঘটনায় আলোচিত কয়েকটি মামলায় ক্ষতিপূরণ মিললেও এখনো অনেকে বঞ্চিত রয়ে গেছেন। কিন্তু বদলায়নি সড়কের চিত্র। আবার দেশে টর্ট আইনের উপযুক্ত চর্চা না থাকায় ক্ষতিপূরণের আশায় মামলা করতে এসে আদালতের বারান্দা থেকে অনেককেই ফিরে যেতে হয়েছে। ফলে প্রতিকারের প্রত্যাশাও বিলীন হয়েছে অনেকের।
এখন প্রশ্ন—দুর্ঘটনা রোধ নাকি পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ, রাষ্ট্র ঠিক কোন পথে হাঁটবে? রাষ্ট্রের দায়িত্বকে শুধুমাত্র দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে সড়ক নিরাপত্তার মূল উদ্দেশ্য অধরাই থেকে যাবে। এই ক্ষতিপূরণ ক্ষতির কিছু আর্থিক পরিণতিকে হয়তো সাময়িকভাবে সামলে নিতে পারে; কিন্তু একটি প্রাণের মৃত্যু কিংবা স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতা পূর্ণ করতে কখনোই বিকল্প হতে পারে না।
তাই সড়কে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান, মালিকপক্ষকে জবাবদিহিতার আও আওতায় আনা, সড়কে ওঠার পূর্বে যানবাহনের ফিটনেস যাচাই, ফিটনেস সার্টিফিকেট দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন, নিরাপদ পথচারী অবকাঠামো গড়ে তোলা, বাহনের ভেতরে-বাইরের উভয় পাশে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, দুর্ঘটনাকবলিত সড়কগুলোর কাছাকাছি কুইক রেসপন্স টিম প্রস্তুত রাখা জরুরি।
পরিবহনের ওভারটেকিং, বেপরোয়া গতি ও ফিটনেস অব্যবস্থাপনার তথ্য, দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ ও ফুটেজ যাচাইয়ের মাধ্যমে জরিমানা ও গণবিজ্ঞপ্তি আকারে তথ্য প্রকাশ করা গেলে সেটিও মালিক এবং চালকদের বেপরোয়া মনোভাবকে পরিবর্তন করতে সক্ষম হবে। আর তাই আদালতের ওপর চাপ কমাতে জরুরি ভিত্তিতে সড়ক পরিবহন আইনের যে বেশ কিছু সংশোধনীর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে—তা স্পষ্ট।
মো. বাহাউদ্দিন আল ইমরান: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। ইমেইল: emran.bae71@gmail.com
যে প্রবাসীদের আয়ে দেশের অর্থনীতি সচল থাকে, সংকটের দিনে ন্যূনতম আইনি সহায়তা না দিয়ে রাষ্ট্র কি নিজের প্রাথমিক দায়িত্ব এড়াতে পারে?
যে প্রবাসীদের আয়ে দেশের অর্থনীতি সচল থাকে, সংকটের দিনে ন্যূনতম আইনি সহায়তা না দিয়ে রাষ্ট্র কি নিজের প্রাথমিক দায়িত্ব এড়াতে পারে?
যে প্রবাসীদের আয়ে দেশের অর্থনীতি সচল থাকে, সংকটের দিনে ন্যূনতম আইনি সহায়তা না দিয়ে রাষ্ট্র কি নিজের প্রাথমিক দায়িত্ব এড়াতে পারে?
যে প্রবাসীদের আয়ে দেশের অর্থনীতি সচল থাকে, সংকটের দিনে ন্যূনতম আইনি সহায়তা না দিয়ে রাষ্ট্র কি নিজের প্রাথমিক দায়িত্ব এড়াতে পারে?