হোমপেজ লোড হচ্ছে…
পরিবারের সদস্যদের মুখে দু’বেলা খাবার তুলে দেওয়াই সাদেকের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থাভাবে প্রায়ই না খেয়ে ঘুমাতে যেতে হয় তার সন্তানদের।
নিজস্ব প্রতিবেদক

আফগানিস্তানে বড় পরিবার এবং অনেক সন্তান আছে এমন দম্পতির দেখা পাওয়া সাধারণ ঘটনা হলেও উরুজগান প্রদেশের মোহাম্মদ সাদেকের পরিবার সম্ভবত অন্যতম একটি বড় পরিবার। ৫৮ সন্তানের বাবা তিনি।
চার স্ত্রী ও বিশাল এই পরিবারকে নিয়ে সাদেকের জীবন কাটছে চরম দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। বিবিসি গ্লোবাল উইমেন এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তার পরিবারের মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুহাম্মদ সাদেক আসলে বাবা হয়েছিলেন ৭০টির বেশি সন্তানের। তাদের মধ্যে এখন ৫৮ জন জীবিত আছে। তার সবচেয়ে ছোট সন্তানের বয়স মাত্র তিন মাস।
সাদেক জানান, বেশি সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ‘নবীর অনুসারীর সংখ্যা বাড়ানো’। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার এই সিদ্ধান্তের আর্থিক ও সামাজিক চাপ এখন প্রকট হয়ে উঠেছে।
সীমিত আয়ের কারণে পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করাও তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। সামান্য উপার্জনে এত বড় সংসার চালাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নানা সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাকে।
পরিবারের সদস্যদের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দেওয়াই সাদেকের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থাভাবে প্রায়ই না খেয়ে ঘুমাতে যেতে হয় তার সন্তানদের। পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানদের শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।
সাদেক একটি গাড়ির শোরুমে কাজ করেন। প্রতিটি গাড়ি বিক্রির বিপরীতে তিনি পান মাত্র ১ হাজার আফগানি। এই সামান্য অর্থ দিয়ে ৬০ জনেরও বেশি সদস্যের পরিবারের খাবার, পোশাক, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করা প্রায় অসম্ভব।
ফলে পরিবারের বড় সন্তানদেরও উপার্জনের কাজে নামতে হয়েছে। তারা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্লাস্টিক ও কাগজের মতো পরিত্যক্ত সামগ্রী সংগ্রহ করে বিক্রি করে। এভাবেই পরিবারের খরচ জোগাতে বাবার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে তারা।
আর্থিক সংকটের পাশাপাশি পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবার অভাবও পরিবারটির দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। চিকিৎসা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণেই সাদেক ও তার স্ত্রীদের অন্তত ১৪ সন্তানকে হারাতে হয়েছে।
মোহাম্মদ সাদেকের প্রথম বিয়ে হয়েছিল যখন তার বয়স ছিল ২০ বছর। বিবিসি-কে তিনি বলেন, তার স্ত্রীরা খুব অল্প বয়সে বিয়ে করেছিলেন।
শৈশব ও কৈশোরেই তারা বিয়ে, গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান এবং সন্তান পালনের বিশাল দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সাদেকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের সময় চার স্ত্রীর বয়সই খুব অল্প ছিল, ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে ছিল তাদের বয়স।
আর সন্তানের সংখ্যা অনেক হওয়ায় তারা যখন সাদেককে ঘিরে জড়ো হয়, তখন বাড়ি হয়ে ওঠে কোলাহলে ভরা, যেন সেখানে কোনও বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে।
'নামটাও মনে থাকে না'
এত বড় পরিবারে এতগুলো সন্তানের সবার নাম মনে রাখাও সাদেকের জন্য কঠিন। তাই তিনি অনেকসময় সন্তানদের নির্দিষ্ট নাম ধরে না ডেকে "বাবা" বা "আমার সন্তান" বলে ডাকেন। তাকে সন্তানদের গুনেও দেখতে হয় অনেক সময়। তখন কখনও কখনও কে কোথায় আছে, তা বুঝতে সমস্যায় পড়েন তিনি।
সাদেক একটি ঘটনার কথা স্মরণ করে বলেন, "এক রাতে আমরা সবাই খাবারের টেবিলে বসেছিলাম। আমি সন্তানদের গোনা শুরু করি এবং দেখি একজন নেই। আমি এও জানতাম না যে, অনুপস্থিত সন্তানটি ছেলে না মেয়ে। পরে আমি তাদের মায়েদের জিজ্ঞেস করি। তখন একজন জানান, তিনি তার সন্তানকে তার নানির বাড়িতে পাঠিয়েছেন এবং সে রাত সেখানেই কাটাবে।"
আবার সন্তানদের বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানেও এক মেয়ের জায়গায় অন্য মেয়ের নাম বলে ফেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে সাদেকের।
নিজের এক মেয়ের বিয়ের ঘটনা বর্ণনা করে সাদেক বলেন, "যে মৌলভি সাহেব বিয়ে পড়িয়েছিলেন, তিনি আমাকে আমার মেয়ের নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে ভুল করে অন্য মেয়ের নাম বলে ফেলি। তখন মৌলভি সাহেব হেসে বললেন, আপনি বাড়ি গিয়ে আবার দেখে আসুন, ভুল নাম বলেছেন কি না।"
অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস
সাদেকের পরিবারের বসবাসের পরিবেশও ভাল না। দরজাহীন কাঁচা ঘরে দরজার পরিবর্তে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে পাতলা পর্দা। যে জায়গায় তারা গোসল করে সেই জায়গাই কাপড় এবং বাসন ধোয়ার জন্য ব্যবহার হয়, আবার শৌচাগার হিসেবেও ব্যবহার হয়।
শীতকালে পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভেতরে এবং গরমের সময় উঠানে বসে খাবার খায়। প্রতিদিন মাত্র দুই বেলা খাবার জোটে। রাতে ঘুমানোর সময় ৬-৭ জনকে ভাগাভাগি করে একটি পাতলা কম্বল গায়ে দিতে হয়।
সাধারণ গদি ছাড়া এই পরিবারের কোনো বিশেষ শোয়ার ব্যবস্থা নেই। বাড়ির ঘরগুলোতে জানালা নেই, মজবুত কোনও দরজাও নেই।জ্বালানির জন্য পরিবারটি মূলত কাগজ এবং সহজলভ্য অন্যান্য উপকরণ পোড়ায়। এমন পরিবেশে শিশুদের বেড়ে ওঠা এবং সুস্থভাবে বেঁচে থাকা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ রয়েছে।
মোহাম্মদ সাদেকের ইচ্ছে
এই অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যেও নিজে পড়াশোনা করতে না পারা মোহাম্মদ সাদেক বলেন, তিনি সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। তবে সীমিত আয়ের কারণে তাদের শিক্ষার ব্যয় বহন করা কঠিন হচ্ছে।
নিজের ইচ্ছের কথা বলতে গিয়ে সাদেক বলেন, তার জীবনে মাত্র দুটি বড় ইচ্ছে রয়েছে। প্রথম ইচ্ছা, সন্তানরা লেখাপড়া শিখুক, ধর্ম এবং পৃথিবী সম্পর্কে জানুক। দ্বিতীয়ত, সন্তানদেরকে যেন কখনও খালি পেটে ঘুমাতে না হয়। তাদের পেট যেন ভরা থাকে।
এ জন্য তিনি আফগান সরকার, আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহযোগিতাও কামনা করেছেন।
সাদেকের পরিবারের এই চিত্র আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দারিদ্র্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, নারীদের অল্প বয়সে বিয়ের মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোকেই সামনে এনেছে।
সাদেকের জীবনসংগ্রাম তাই কেবল একজন বাবার বিশাল সংসার সামলানোর কাহিনী নয়; এটি দারিদ্র্য, অপুষ্টি, শিক্ষার অভাব এবং মাতৃস্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতায় জর্জরিত একটি পরিবারের বাস্তব চিত্র।
অং সান সু চির ছেলে কিম অ্যারিস লন্ডনে মিয়ানমার দূতাবাসের মাধ্যমে টেলিফোনে মায়ের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে জানিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী সমর্থিত প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র।
অং সান সু চির ছেলে কিম অ্যারিস লন্ডনে মিয়ানমার দূতাবাসের মাধ্যমে টেলিফোনে মায়ের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে জানিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী সমর্থিত প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র।