হোমপেজ লোড হচ্ছে…

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এই মুহূর্তে সৌদি আরবগামী অনেক শ্রমিক ফ্লাইটের আশায় অপেক্ষা করছেন। কারও ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে, কারও ছুটির শেষ দিন পেরিয়ে যাচ্ছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য, সৌদি বিমানবন্দরে চলাচলের সীমাবদ্ধতায় ৬২টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, ভোগান্তিতে পড়েছেন ৯ হাজার ৬৭৪ যাত্রী, যাদের বড় অংশ প্রবাসী শ্রমিক। ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরে হামলায় ১২ জন নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি। বিমান বাংলাদেশ রিয়াদের ফ্লাইট স্থগিত রেখেছে, আর দাম্মামে ২১ অক্টোবর থেকে ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা করছে।
এই মানুষগুলোর পাঠানো টাকাই এখন অর্থনীতির সবচেয়ে ভরসার জায়গা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স এসেছে, আগের বছরের ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়নের চেয়ে যা প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে রপ্তানি আয় ওই অর্থবছরে ২ শতাংশ কমে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ রপ্তানি যখন ধীর, তখন বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য অনেকটাই প্রবাসীদের কাঁধে। ভরসা যত বড় হয়, তার ভিত নিয়ে প্রশ্নও তত জরুরি হয়ে ওঠে।
মোট প্রবাহ তো বাড়ছে, তাহলে দুশ্চিন্তা কিসের? দুশ্চিন্তা আসলে বৃদ্ধির চরিত্র নিয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, গত অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে এসেছে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার, মোট প্রবাহের যা প্রায় ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। আগের বছর সৌদি থেকে এসেছিল ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সৌদি থেকে আয় বেড়েছে প্রায় ৩৭ শতাংশ, যেখানে মোট প্রবাহ বেড়েছে ১৭ শতাংশের কিছু বেশি।
আমার হিসাবে এক বছরে সৌদির হিস্যা প্রায় ১৪ শতাংশ থেকে সাড়ে ১৬ শতাংশে উঠেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সেটা দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ২ শতাংশে, অঙ্কে যা ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার, গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৪ শতাংশ বেশি। একই সময়ে আমিরাত থেকে রেমিটেন্স কমেছে ১২ দশমিক ৬১ শতাংশ, মালয়েশিয়া থেকে ১৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। প্রথম প্রান্তিকে মোট রেমিটেন্স যতটা বেড়েছে, তার কতটা এসেছে সৌদি থেকে? আমার হিসাবে প্রায় ৪২ শতাংশ। বৃদ্ধির ভার ক্রমেই এক দেশের কাঁধে চেপে বসছে।
শ্রমবাজারেও একই চিত্র। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশে গেছেন ১১ লাখের বেশি কর্মী, তার মধ্যে সাড়ে ৭ লাখের বেশি গেছেন সৌদি আরবে, যা এক বছরে একক কোনো দেশে এত কর্মী পাঠানোর রেকর্ড। অথচ ২০২৩ সালে মোট ১৩ লাখের বেশি কর্মী বিদেশে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ মোট বিদেশগামী কমেছে, সৌদির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। সৌদিতে এখন প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি কাজ করেন।
এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। আজ যে রেমিটেন্স আসছে, তা যারা আগে থেকেই বিদেশে আছেন তাদের আয়। আগামী বছরের প্রবাহ নির্ভর করবে আজ কত নতুন কর্মী যেতে পারছেন তার ওপর, আর বিমানের ফ্লাইট বাতিলের এই সময়ে ওই যাত্রা থমকে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল, পশ্চিম এশিয়া গত অর্থবছরের রেমিটেন্সের প্রায় অর্ধেক জোগান দিয়েছে। সংকট দীর্ঘ হলে প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
লক্ষণ কি ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে? পুরোপুরি বলা যায় না, তবে একটি সংকেত আছে। সেপ্টেম্বরে এসেছে ২৭৭ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের চেয়ে মাত্র ৩ শতাংশ বেশি এবং ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর সঙ্গে আরেকটা ব্যাখ্যা যোগ করা দরকার। যুদ্ধের মধ্যে অনেক প্রবাসী ভবিষ্যতের নিরাপত্তার কথা ভেবে বাড়তি অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। তা সত্যি হলে ১৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির একটা অংশ টেকসই ধারার চেয়ে সতর্কতামূলক পাঠানো টাকার প্রতিফলন। আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত নই, তবে নীতিনির্ধারকদের এই সম্ভাবনা ধরে নিয়েই হিসাব কষা উচিত।
দেশের একজন খ্যাতিমান সম্পাদক ও পথিকৃৎ সাংবাদিককে যখন সবাই স্মরণ করছেন, তখন আহমেদ আহসানুজ্জামান তুলে ধরেছেন তার বন্ধু তৌফিক ইমরোজ খালিদীর একান্ত ব্যক্তিগত কিছু স্মৃতি।
রেমিটেন্স কমলে প্রথম ধাক্কা লাগে গ্রামের পরিবারে। এই টাকায় খাবার, ওষুধ, সন্তানের পড়াশোনা আর বিদেশ যাওয়ার সময় নেওয়া ঋণের কিস্তি চলে। আয় কমলে ব্যয় সংকুচিত হয়, আর ওই চাপ গিয়ে পড়ে গ্রামের দোকান, পরিবহন আর নির্মাণকাজে। দ্বিতীয় ধাক্কাটি লাগে সামষ্টিক অর্থনীতিতে। সৌদি শুধু রেমিটেন্সের নয়, জ্বালানিরও উৎস। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য উদ্ধৃত করে দেশের প্রথম সারির একটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মার্চের শুরু পর্যন্ত আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩৫ শতাংশ এসেছে সৌদি আরব থেকে। বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে ঝুঁকি বাড়ায় বিপিসি এখন বিকল্প উৎস খুঁজছে। অর্থাৎ এক দেশের সংকটে ডলার আয়ের ঝুঁকি আর জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি একসঙ্গে বাড়ছে। এই দুই চাপ একসঙ্গে এলে রিজার্ভ আর বিনিময় হারে ধাক্কা এড়ানো কঠিন।
পূর্বাভাসগুলোও একই দিকে ইঙ্গিত করছে। আইএমএফের অক্টোবরের পূর্বাভাসে চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশ, এপ্রিলে যা ধরা হয়েছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ, অর্থাৎ ১ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট কম। গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশ, এপ্রিলে যা ধরা হয়েছিল ৬ শতাংশ। এডিবি সেপ্টেম্বরে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৫ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশে এনেছে এবং জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় ও অনিশ্চয়তার কারণে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি কমার কথা বলেছে। সরকারের লক্ষ্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এই ফারাক সামান্য নয়। বিনিয়োগ যেখানে দুর্বল, সেখানে ভোগই অর্থনীতিকে টেনে রাখে, আর ভোগের একটি বড় জোগান প্রবাসীর পাঠানো টাকা।
তাহলে ঘরের ভেতরে করণীয় কী? কর্মসংস্থান আর বিনিয়োগ বাড়ানো। বাংলাদেশ ব্যাংক ২৩ মে বন্ধ কারখানা ও অর্থনীতি সচল করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যার ২০ হাজার কোটি টাকা বন্ধ কারখানার জন্য। উদ্যোগটি সঠিক। কিন্তু আরেকটি প্রতিবেদন বলছে, সাড়ে তিন মাস পরও এই ২০ হাজার কোটি টাকা থেকে এক টাকাও ছাড় হয়নি। কারণ ঋণ পেতে আগের খেলাপি ঋণ নিয়মিত করতে হয়, আর বন্ধ কারখানার অধিকাংশেরই ঋণ এখন খেলাপি। যাদের সবচেয়ে বেশি দরকার, শর্তের কারণেই তারা দরজার বাইরে রয়ে গেছে। আমার মতে, স্বচ্ছ মানদণ্ডে বাছাই করা কারখানার জন্য খেলাপি ঋণ পুনর্গঠনের সঙ্গে নতুন ঋণ যুক্ত করা যায়, যেখানে মূল শর্ত হবে কর্মসংস্থান ধরে রাখা ও নতুন কর্মী নেওয়া। অবশ্যই ইচ্ছাকৃত খেলাপিকে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না।
বিদেশের শ্রমবাজার নিয়ে আমার অবস্থান দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথমত, সৌদি আরব ছাড়ার কোনো সুযোগ নেই। দেশটি ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করবে এবং অবকাঠামো ও সেবা খাতে বড় কর্মসূচি নিয়ে এগোচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশি কর্মীর সুযোগ আছে, তবে তা কাজে লাগাতে দরকার দক্ষ কর্মী আর সহজ ভিসা প্রক্রিয়া। অদক্ষ কর্মী পাঠিয়ে আমরা কম মজুরির ফাঁদে আটকে থাকি, কিন্তু দক্ষ কর্মী গেলে আয় আর দরকষাকষির শক্তি দুটোই বাড়ে।
দ্বিতীয়ত, সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখা চলবে না। পশ্চিম এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাইরে অন্য সম্ভাব্য দেশেও কর্মী পাঠানোর চেষ্টা করতে হবে। ইউরোপ বা জাপানের মতো বাজারে ঢুকতে ভাষা, কারিগরি যোগ্যতা আর নিয়োগবিধির প্রস্তুতি লাগে, যা বহু বছরের কাজ। আজ শুরু না করলে পাঁচ বছর পরও আমরা একই জায়গায় আটকে থাকব।
আটকে পড়া কর্মীদের জন্য তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি। পররাষ্ট্র, প্রবাসী কল্যাণ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি সার্বক্ষণিক সেল ভিসার মেয়াদ বাড়ানো, জরুরি সহায়তা আর বিকল্প যাত্রাপথের ব্যবস্থা দেখতে পারে। বিকল্প রুটের টিকিটের দাম কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। যারা কাজে ফেরার তাড়ায় আছেন, তাদের ওপর এই বাড়তি বোঝা কমানোর উপায় খোঁজা দরকার।
ব্যাংকিং খাতের মানুষ হিসেবে আমি তিনটি প্রধান কাজ দেখি। প্রথমত, প্রবাস আয় যত আনুষ্ঠানিক পথে আসবে, রিজার্ভ আর বিনিময় হারে তার প্রভাব তত দৃঢ় হবে; তাই ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবায় অর্থ প্রেরণ সহজ ও সস্তা রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, গ্রামে টাকা তোলার খরচ ও দূরত্ব কমাতে হবে। তৃতীয়ত, দেশে ফেরা কর্মীদের জন্য সহজ শর্তে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ঋণ চালু রাখতে হবে। যিনি বিদেশে কাজ হারিয়ে ফিরলেন, তার জমানো অর্থ আর অর্জিত দক্ষতা দেশেই কাজে লাগানোর সুযোগ করে দিলে ধাক্কার ক্ষতি কিছুটা সামলানো যায়।
এই সংকটকে আমরা সতর্কবার্তা হিসেবে নিলে দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হব। প্রবাসী আয় আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি, কিন্তু একটি দেশের ওপর অতিনির্ভরতা ওই শক্তিকেই ঝুঁকিতে ফেলে। বিকল্প শ্রমবাজার, দক্ষতা উন্নয়ন, আনুষ্ঠানিক প্রেরণ ব্যবস্থার প্রসার আর দেশের ভেতরে কর্মসংস্থান বাড়ানো; এই চারটি কাজ একসঙ্গে এগোলে ওই ধাক্কা আমাদের আরও টেকসই অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা সহজ। যে মানুষগুলো বিদেশের মাটিতে ঘাম ঝরিয়ে আমাদের অর্থনীতিকে টেনে ধরে রেখেছেন, আমরা কি তাদের জন্য একটি নিরাপদ ও বহুমুখী ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে প্রস্তুত? উত্তরটা নির্ভর করছে আগামী কয়েক মাসে নীতিনির্ধারকেরা কী সিদ্ধান্ত নেন তার ওপর।
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক। ইমেইল: shammo4n@gmail.com
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা হেরে গেলে আটকে যেতে পারে ট্রাম্পের সব যুদ্ধ পরিকল্পনা ও নীতি, এমনকি সামনে আসতে পারে অভিশংসনও।
জীবন বাজি রেখে ভিটেমাটি বেচে বিদেশে গিয়ে কেন অদক্ষ শ্রমিকদের মৃত্যুদণ্ডের মতো করুণ পরিণতি বরণ করতে হবে?
প্রিন্ট মিডিয়ার নিউজরুমে বসে দেখা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রভাব থেকে শুরু করে ডেটা জার্নালিজমের নবায়ন—তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে নিয়ে সাবেক সহকর্মী পলাশ দত্তের স্মৃতিচারণ।