হোমপেজ লোড হচ্ছে…

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস-এলপিজির বাজারে অস্থিরতা ও ব্যবসায়ীদের নানামুখী চাপের মুখে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন যে গণশুনানির আয়োজন করেছে, সেখানে এ খাতের ব্যবসায়ীরা কমিশন বাড়ানোর দাবি তুলে ধরেছেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান যুদ্ধ, সাগরে জাহাজ ভাড়া থেকে রাস্তায় ট্রাকের খরচ বেড়ে গেছে, এমন নানা যুক্তিতে এলপিজির আমদানিকারক, ডিলার ও পরিবেশকরা তাদের বাড়তি কমিশনের ফর্দ দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার বিয়াম মিলনায়তনে আয়োজিত গণশুনানিতে তাদের এসব প্রস্তাবের বিপরীতে জেরাকারীরা বলেছেন, ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবনা দেখে মনে হচ্ছে রাশিয়ায়-ইউক্রেন যুদ্ধ কিংবা ইরান যুদ্ধের পুরো খরচ বহন করছে বাংলাদেশ।
যুদ্ধের কারণে যদি এখন গ্যাসের দাম বাড়াতে হয় তাহলে গত ডিসেম্বরে কেন আড়াই হাজার টাকা করে ১২ কেজির একেকটা সিলিন্ডার কিনতে হল, এমন প্রশ্নও রেখেছেন তারা।
অপারেটরদের ‘সৃষ্ট’ কৃত্রিম সংকটের মুখে বিইআরসি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, এমন অভিযোগ এসেছে জেরাকারীদের মুখ থেকে।
এছাড়া কমিশন বাড়ালে অবধারিতভাবেই এলপিজির দাম আরেক দফায় বাড়বে, এই গণশুনানি সেই দাম বাড়ানোর কেবল আনুষ্ঠানিকতা কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অক্টোবর মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১৮৩৭ টাকা করা হয়। তবে দেশের প্রায় কোথাও এ দামে এলপিজি কিনতে পারছেন না ভোক্তারা, সিলিন্ডারপ্রতি ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে।
দাম বাড়ানোর আগে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে বাজারে এলপিজি সরবরাহ সংকট দেয়। ৪ অক্টোবর দাম বাড়ানোর হলেও এলপিজির বাজারে অস্থিরতা চলছে।
বর্তমান সরকারি দামে তাদের না পোষানোর কথা তুলে ধরে নতুন মূল্য নির্ধারণে কমিশন বাড়ানোসহ গ্যাস বাজারজাত করার বিভিন্ন ধাপে বাড়তি ব্যয়ের সমন্বয় চায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বোতলজাতকারী কোম্পানিগুলো।
কোম্পানিগুলো কেজিপ্রতি গ্যাস মজুত ও বোতলজাত করার খরচের সঙ্গে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর আবেদন করেছে। পাশাপাশি বিনিয়োগের ওপর মুনাফা বাড়ানোর দাবিও জানিয়েছে।
পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের সংগঠন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড গত ১৫ এবং ১৬ অক্টোবর ধর্মঘটের ডাক দেয়।
সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে ১৪ অক্টোবর সেই কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয়। আর সেদিনই এই গণশুনানির ঘোষণা আসে। ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে বিইআরসি এই গণশুনানির আয়োজন করেছে কিনা, এমন প্রশ্ন উঠেছে শুনানিতে।
গণশুনানিতে এলপিজি আমদানিকারক, পরিবেশক ও অটোগ্যাস স্টেশন মালিক সমিতির প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন। তারা সবাই নিজ নিজ কমিশন বৃদ্ধির প্রস্তাব রেখেছেন।
সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির সিলিন্ডারের কমিশন আমদানিকারকেরা ৩০০ টাকার বেশি ও পরিবেশকেরা ১৫০ করার দাবি তুলেছেন। আর গাড়িতে ব্যবহৃত অটোগ্যাস স্টেশন মালিকরা তাদের কমিশন ৮ টাকা থেকে ১১ টাকা করার প্রস্তাব করেন।
শুনানিতে ১২ কেজির সিলিন্ডারে বর্তমান কমিশন ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ওমেরা ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেল্টা ৩৬০ টাকা করার প্রস্তাব করে। তবে সবচেয়ে কম ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে মেঘনা গ্রুপ।
অন্যদিকে পরিবেশকরা তাদের কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা, খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে।
গণ শুনানিতে মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা বলেন, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আগে জাহাজভাড়াসহ প্রিমিয়াম ছিল প্রতি টনে ৮০ থেকে ১২০ ডলার। এটি এখন ২৫০ থেকে ৪০০ ডলারে ঠেকেছে। পরিচালন খরচ বেড়েছে। সব বিবেচনায় নিয়ে এমন দাম নির্ধারণ করা উচিত, যাতে নির্ধারিত দামের চেয়ে এক টাকা বেশি বাজারে কেউ নিতে না পারে।
ঢাকায় প্রথম পর্বের আলোচনায় ১৩টি ওয়ার্কিং গ্রুপ এফটিএর সংশ্লিষ্ট অধ্যায়ের খসড়া পাঠ ও কাঠামোগত বিষয় পর্যালোচনা করে।
আমদানিতে না থাকা ওরিয়ন গ্যাসের চিফ অপারেটিং অফিসার অনুপ কুমার সেন বলেন, নতুন বাস্তবতায় ১০টা কোম্পানি আমদানি করতে পারছে না। তাদের অবকাঠামো অব্যবহৃত অবস্থায় পড়েছে। এতে বাজারে সিলিন্ডার সংকট তৈরি হয়েছে। অন্য কোম্পানির কাছ থেকে কিনে নিয়ে বিইআরসির দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়। তাই পাইকারি দাম নির্ধারণের দাবি তাদের।
বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার দাবি তুলে ধরে তিনি বলেন, এর ফলে কৃত্রিম সংকট কমবে ও বাজারে অন্যায্য দাম নেওয়া বন্ধ হবে।
পরিবেশক মেসার্স উজ্জল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মনি মুক্তা পাল বলেন, অলস সিলিন্ডারের বোঝা বহন করতে হচ্ছে। সিলিন্ডারে ১৫০ টাকা কমিশনের দাবি পূরণ না হলে বাজারে চলমান পরিস্থিতি বিরাজমান থাকবে ও দাম কমবে না।
আরেক পরিবেশক তাহের এন্টারপ্রাইজের আবু তাহের কোরাইশি বলেন, যত্রতত্র দোকান দিয়ে ব্যবসা করা বন্ধ করতে হবে।
অটোগ্যাস সমিতির সভাপতি সিরাজুল মাওলা বলেন,
২ লাখের বেশি গাড়ি এলপিজি দিয়ে চলে। ২০২১ সালে ৮ টাকা কমিশন নির্ধারণ করেছিল। এরপর পাঁচ বছর চলে গেছে। পরিচালন খরচ বেড়েছে।
তার দাবি, দেশের ১১০০ অটোগ্যাস পাম্পের মধ্যে ৮০ শতাংশই লোকসানে চলছে। কমিশন ১০ টাকা হলে ক্ষতি দূর হবে, কিছুটা মুনাফা দিয়ে ১১ টাকা করার দাবি তাদের। এটা ছাড়া টেকা সম্ভব নয় বলে দাবি করেন সিরাজুল মাওলা।
দেশে সক্রিয় ৩৫টি কোম্পানি মধ্যে এলপিজি আমদানির অবকাঠামোগত সক্ষমতা আছে ২৩টি কোম্পানির। গত মাসে আমদানি করেছে মাত্র ১০টি কোম্পানি।
জেরাকারীদের একজন সাংবাদিক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “ব্যবসায়ীদের কথা শুনে মনে হচ্ছে ওই দিকে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ এবং এদিকে ইরান যুদ্ধের পুরো খরচ বাংলাদেশ বহন করছে। কিন্তু গত ডিসেম্বরেও আমাদের সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে আড়াই হাজার টাকা করে। তখন কেন এত বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হল, সেই ব্যাখ্যা কারো কাছে নেই।
“দাম বাড়বে বলে কোম্পানিগুলো গ্যাস আটকে রেখেছে, কিন্তু বিইআরসি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।”
ঢাকাতে এখন ২২০০ টাকার নিচে সিলিন্ডার পাওয়া যায় না। ব্যবসায়ীদের এসব দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবকে অযৌক্তিক ও দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন সিরাজুল ইসলাম।
ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকায় বিক্রি হবে।
কাস্টমস গোয়েন্দাদের তথ্য, “১৭ অক্টোবর পাকিস্তান থেকে ছেড়ে আসা চালানটি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায় ১৯ অক্টোবর।”
এর আগে দুই সপ্তাহে চার দফায় ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে মোট ১০ হাজার ৪৩৯ টাকা কমানো হয়েছিল।