হোমপেজ লোড হচ্ছে…
পেশাগত আলাপচারিতা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবনের বিশেষ মুহূর্ত পর্যন্ত, কাজে ও ভাবনায় প্রায় দুই দশকজুড়ে কীভাবে একজন সাংবাদিক হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বস্ত বন্ধু, পরামর্শদাতা এবং সহযাত্রী, তারই স্মৃতিচারণ করছেন দেবারতি গুহ।
দেবারতি গুহ

কেউ কেউ কীর্তি রেখে যান। আবার কেউ রেখে যান স্মৃতি। তৌফিক ইমরোজ খালিদী দুটোই রেখে গেছেন।
ছেলেকে দেখতে লন্ডনে গিয়েছিলেন তৌফিক ভাই। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলো। গত দোসরা অক্টোবর, ৫৯ বছর বয়সেই তিনি চলে গেলেন।
তিনি চলে গেছেন কয়েকদিন হয়ে গেল। কিন্তু এখনও আমি আনমনেই ফোন হাতে নিচ্ছি। তৌফিক ভাইকে মেসেজ করতে হবে।
নতুন একটা জার্নালিস্টিক প্রজেক্ট মাথায় ঘুরছে, তৌফিক ভাইয়ের পরামর্শ দরকার। বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি যে বদলে যাচ্ছে, তার ভাবনাটা জানা দরকার।
কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ছে, তৌফিক ভাই যে আর নেই।
বিশ্বের কাছে তিনি ছিলেন ের প্রধান সম্পাদক; বাংলাদেশের ডিজিটাল সাংবাদিকতার মূল স্থপতিদের একজন।
আমার কাছে তিনি ছিলেন তার চেয়েও বেশি কিছু।
তিনি ছিলেন আমার বন্ধু।
ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পর সাংবাদিকতা করেছেন দ্য ডেইলি স্টারে, লন্ডনে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কাজ করেছেন। তারপর ২৪ ঘণ্টার একটি অনলাইন নিউজরুম গড়ে তোলার সংকল্প নিয়ে ২০০৬ সালে বাংলাদেশে ফেরেন তৌফিক ভাই।
একটি প্রজন্মের সাংবাদিকদের তিনি অনুপ্রাণিত করেছিলেন। সংবাদ, প্রযুক্তি আর গল্প বলার কৌশল কীভাবে নতুন আঙ্গিকে একসূত্রে গাঁথা যায়, অনলাইনেও কীভাবে স্বাধীন সাংবাদিকতা বিকশিত হতে পারে, তা তিনি দেখিয়েছেন।
তার নেতৃত্বে এশিয়ার প্রথম কোনো সংবাদমাধ্যম হিসেবে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর টার্নিং পয়েন্টস ম্যাগাজিন যৌথভাবে সম্পাদনা করে। সাংবাদিকতায় তার অবদান আগামীতেও স্মরণ করা হবে।
প্রায় দুই দশকের সৌহার্দ্য
২০০৮ সালের দিকে ডয়চে ভেলে যখন ের কনটেন্ট পার্টনার হল, তখনই আমাদের প্রথম দেখা। প্রথম দিককার আলাপে ভাষার ওপর তার অসাধারণ দক্ষতা এবং রাজনীতি, সমাজ ও বিশ্বপরিস্থিতি নিয়ে গভীর বোঝাপড়া দেখে আমি অভিভূত হয়েছিলাম।
স্থানীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক নানা বিষয়, সবকিছু নিয়েই তিনি নিজের যুক্তি তুলে ধরতে পারতেন অনায়াসে। তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডা মানেই ছিল নতুন চিন্তার খোরাক মেলা।
পেশাগত যোগাযোগ থেকে যে সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা প্রায় ২০ বছর স্থায়ী বন্ধুত্বের রূপ নেয়। আমার ক্যারিয়ারের প্রতিটি ধাপে তার পরামর্শ আমি পেয়েছি। প্রশংসাও করতেন একদম মন থেকে।
যখনই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, আমার প্রতি তার সেই আস্থা আমাকে শক্তি দিয়েছে। একাধিকবার তিনি আমাকে বলেছেন, তিনি চান, আমরা যেন একসঙ্গে কাজ করি। প্রায়ই আমরা ভবিষ্যতের নানা যৌথ উদ্যোগ আর সাংবাদিকতার বিভিন্ন কাজ নিয়ে পরিকল্পনা করতাম। তার উৎসাহ, উদ্দীপনা আমার মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ত।
২০১০, ২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৯ সালে ডয়চে ভেলের ‘গ্লোবাল মিডিয়া ফোরাম’-এ যোগ দিতে জার্মানির বনে এসেছিলেন তৌফিক ভাই। কয়েকটি অনুষ্ঠানে তার ছেলে রাদ শারার খালিদীকেও সঙ্গে এনেছিলেন। সেই সফরগুলো কখনোই শুধু কনফারেন্স হলের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল না। আমরা একসঙ্গে খেয়েছি, হাসিমুখে সময় কাটিয়েছি; সাংবাদিকতা, গণতন্ত্র আর গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘ আড্ডায় মেতে উঠেছি।
একটি অমূল্য উপহার
গত বছরের ২৫ অক্টোবর কলকাতায় আমার ৫০তম জন্মদিন উদযাপন করলাম। বাংলাদেশ থেকে আসা একমাত্র অতিথি ছিলেন তৌফিক ভাই। আমার জন্য বিশেষ একটি উপহার নিয়ে তিনি হাজির হয়েছিলেন: আধুনিক ডিজাইনের চমৎকার একটি শাড়ি।
এ মাসে গুরুত্বপূর্ণ এক অনুষ্ঠানে পরব বলে শাড়িটি আমি রেখে দিয়েছিলাম। প্রতিবার যখন ওটার দিকে তাকাই, তার কথা আর বাংলাদেশে একটি অনুষ্ঠানে তার দেওয়া আমন্ত্রণের কথা আমার মনে পড়ে। কে জানত, তিনি নিজেই আর সেখানে থাকবেন না?
একটি নৈশভোজ
২০২৪ সালের জুলাই মাস। বাংলাদেশের রাজনীতিকে বদলে দেওয়া উত্তাল সেই সময়ে আমি ঢাকায় গেলাম। তৌফিক ভাই আমাকে তার বাসায় নিমন্ত্রণ করলেন। বহু বন্ধু, সহকর্মী আর সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন সেখানে, আড্ডা গড়িয়েছিল গভীর রাত পর্যন্ত।
প্রশাসনের মামলার মুখে কয়েক বছর কাটানো একজন মানুষের পক্ষে সেটা ছিল খুবই সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ। তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো পরে তুলে নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর আদালত তাকে সব অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়।
এখন পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, সেই সন্ধ্যা ছিল এমন এক সময়, যা আমাদের অজান্তেই নিঃশব্দ এক বিদায় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল।
সাংবাদিকের চেয়েও বেশি কিছু
তৌফিক ভাই নেই; আমার কেবল অসাধারণ একজন সাংবাদিকের কথাই মনে পড়বে না, আমার মনে পড়বে ব্যক্তি তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে; তার কৌতূহল, সহানুভূতি, রসবোধ, একনিষ্ঠতা আর সাংবাদিকতার প্রতি তার দায়বদ্ধতার কথা আমার মনে পড়বে।
তিনি মারা গেছেন দোসরা অক্টোবর, যে তারিখটি আগে থেকেই আমার ব্যক্তিগত আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। দিনটি আমার প্রয়াত মায়ের জন্মদিন। সেই তারিখ এখন আরও একটি স্মৃতি বহন করবে। প্রতি বছর এই দিনে আমি দুজন মানুষকে স্মরণ করব।
এই ক্ষতি অপরিমেয়। এখনো কত কাজ বাকি রয়ে গেছে, আরও কত কত বিষয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন ছিল, একসঙ্গে আমাদের অনেক কিছু করার কথা ছিল।
আমরা দুজনই ভেবেছিলাম, আবার কোনো কনফারেন্স হবে, হয়তো কোনো নৈশভোজ, আবার আমাদের দেখা হবে।
আমার ৫০তম জন্মদিনের ছবিগুলোর দিকে যখন তাকাই, আমি শুধু একজন বিশিষ্ট সাংবাদিককে দেখি না; একজন বন্ধুকেও দেখি, যিনি আমার জীবনের বিশেষ এক মুহূর্ত উদযাপন করতে সীমান্ত পেরিয়ে এসেছিলেন। তিনি সাংবাদিকতায় যতটা আন্তরিক ছিলেন, বন্ধুদের জন্যও ঠিক ততটাই।
বাংলাদেশ তার গণমাধ্যমের অন্যতম ঋজু ব্যক্তিত্বকে হারাল, আর হারাল তার দিশারিকে। তার ছেলে রাদ হারিয়েছে তার বাবাকে। আর আমি হারিয়েছি প্রিয় এক বন্ধুকে।
তৌফিক ভাই, আপনার বন্ধুত্ব, আপনার প্রজ্ঞা, স্বাধীন সাংবাদিকতায় আপনার উৎসাহ আর আস্থার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার অভাব আমরা গভীরভাবে অনুভব করব, কিন্তু আপনাকে কখনো ভুলব না।
দেবারতি গুহ: ডয়চে ভেলের এশিয়া বিভাগের ডিরেক্টর অব প্রোগ্রামস।
জীবন বাজি রেখে ভিটেমাটি বেচে বিদেশে গিয়ে কেন অদক্ষ শ্রমিকদের মৃত্যুদণ্ডের মতো করুণ পরিণতি বরণ করতে হবে?
প্রিন্ট মিডিয়ার নিউজরুমে বসে দেখা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রভাব থেকে শুরু করে ডেটা জার্নালিজমের নবায়ন—তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে নিয়ে সাবেক সহকর্মী পলাশ দত্তের স্মৃতিচারণ।
ভারতে আগামী ১ নভেম্বর থেকে সিম কার্ডের নামেই মিলবে কলারের পরিচয়। থার্ড পার্টি অ্যাপ বা টাকা খরচ ছাড়া এমন মৌলিক সাইবার নিরাপত্তা সুবিধা বাংলাদেশের সাধারণ গ্রাহকদের দিতে টেলিকম অপারেটর ও বিটিআরসি কি উদ্যোগী হতে পারে না?
যে প্রবাসীদের আয়ে দেশের অর্থনীতি সচল থাকে, সংকটের দিনে ন্যূনতম আইনি সহায়তা না দিয়ে রাষ্ট্র কি নিজের প্রাথমিক দায়িত্ব এড়াতে পারে?