হোমপেজ লোড হচ্ছে…
ফেইসবুক লাইভে লোক জড়ো করে পিটিয়ে হত্যা, অতঃপর মরদেহের ছবি পোস্ট! মবের জোশ যখন ডিজিটাল প্রযুক্তিতে প্রস্ফুটিত, তখন বিচারের সংস্কৃতি পড়ে রয়েছে মধ্যযুগে।
মো. আবু নাসের

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভোগা ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের ৩৮ বছর বয়সী এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার আগে ফেইসবুকে লাইভ করে লোকজনকে জড়ো করেন অভিযুক্তরা। এরপর দফায় দফায় তাকে মারধর করা হয়। পুলিশ আহত শামীমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেও হামলাকারীরা গিয়ে তাকে পেটায়। একপর্যায়ে টেনেহিঁচড়ে হাসপাতালের বাইরে নিয়ে গিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। শেষে মরদেহের ছবি ফেইসবুকে 'পোস্ট' করা হয়; যেন শিকার শেষে ট্রফির ছবি!
ফেইসবুকের বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ফজলুল হক আমিনী তার ফেইসবুক (Fh Ameni) প্রোফাইল থেকে লোকজন জড়ো করতে দুই দফা লাইভ করেন। স্থানীয় এক সাংবাদিকের সঙ্গে শুক্রবার বিকেলে এ নিয়ে আলাপ হয়েছিল। তিনি বললেন, ওই ঘটনার পর দুই জনকে গ্রেপ্তার করা হলে মূল হোতা আমিনী বুক চিতিয়ে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
আমিনীর ফেইসবুক লাইভকাণ্ডে নতুন কিছু নেই; নতুন শুধু প্রযুক্তি। আগে মব ডাকার জন্য মাইকে ঘোষণা হতো, এখন ‘লাইভ’ হয়। মবের জোশ ডিজিটাল হয়েছে, কিন্তু বিচারের সংস্কৃতি রয়ে গেছে মধ্যযুগে।
বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এখন প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। অভিযোগ ওঠাই যথেষ্ট, বাকিটা মবের কাজ। ২০১২ সালে রামুতে ফেইসবুকের একটি ট্যাগ করা ছবিকে কেন্দ্র করে ১২টি বৌদ্ধ মন্দির ও বিহার এবং বহু বাড়িঘর পুড়িয়ে ফেলা হয়। ২০১৬ সালে নাসিরনগরে একটি ভুয়া পোস্টের জেরে কয়েক ডজন মন্দির ও শত শত বাড়ি ভাঙচুর করা হয়।
২০১৭ সালে রংপুরের ঠাকুরপাড়ায় একইভাবে হিন্দুদের ঘরবাড়ি জ্বলেছে। ২০১৯ সালে ভোলায় এক ফেইসবুক পোস্টকে ঘিরে বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে চারজন মারা যান। ২০২১ সালে কুমিল্লার পূজামণ্ডপে কোরআন রাখার গুজবে সারা দেশে সহিংসতা ছড়িয়েছে, প্রাণ গেছে একাধিক মানুষের।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে রংপুরের গঙ্গাচড়ার একটি গ্রামে এক কিশোরের বিরুদ্ধে ফেইসবুকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগের পর ২২টি হিন্দু বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।
ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে কবরের গঠন ও ‘ইমাম মাহদি’ পরিচয় নিয়ে আপত্তির জেরে জুমার নামাজের পর ‘উত্তেজিত জনতা’ নুরুল হক ওরফে 'নুরাল পাগলা'র দরবার ও বাড়িতে হামলার পর তার মরদেহ কবর থেকে তুলে মহাসড়কে পুড়িয়ে দেয়। এতে অন্তত ৫০ জন আহত হন এবং তার অনুসারী রাসেল মোল্লা মারা যান।
একই বছরের ডিসেম্বর মাসে ময়মনসিংহের ভালুকায় ইসলাম ও মহানবী সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে ২৭ বছর বয়সী পোশাকশ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে একদল মানুষ পিটিয়ে হত্যা করে। পরে তার মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এ বছরের এপ্রিল মাসে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ফিলিপনগরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সুফিবাদী পীর শামীম রেজার দরবারে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর তাকে পিটিয়ে ও ধারালো অস্ত্রে আঘাত করে হত্যা করা হয়।
প্রতিবার একই চিত্রনাট্য: একটি পোস্ট, একটি গুজব, একদল উন্মত্ত মানুষ, একটি পোড়া জনপদ। আর প্রতিবার সেই একই প্রতিশ্রুতি—'দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে'। এই আওতা সম্ভবত এমন এক বিশাল ছাতা, যার নিচে এত বছরেও কেউ পৌঁছায়নি।
লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, এই সংঘাতের ধারা প্রায় সব সময় এক দিকে প্রবাহিত। দেশের ইতিহাসে ধর্মবিশ্বাসী কারও ওপর অবিশ্বাসীরা হামলা চালিয়েছে বা পিটিয়ে মেরেছে, এমন নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। বরং লেখক ড. অভিজিৎ রায়, ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান ও নিলয় নীলকে চাপাতির নিচে প্রাণ দিতে হয়েছে। যারা সংখ্যায় কম এবং ক্ষমতায় দুর্বল, ঘটনার শিকার হন তারাই।
বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে স্থান পেয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ধর্মের ব্যবহার কখনো বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মীয় পরিচয় ও অনুভূতিকে নিজেদের ক্ষমতা সুসংহত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
আজ বাংলাদেশের সাংবিধানিক বাস্তবতাও দ্বৈত। ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম, আবার ধর্মনিরপেক্ষতাও সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি। এই দ্বৈততা নিজে থেকেই সব সমস্যার কারণ নয়; কিন্তু ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক আনুগত্যের মাপকাঠি বানালে নাগরিকত্বের সমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশে মুসলমান ৯১.০৮ শতাংশ, হিন্দু ৭.৯৫ শতাংশ। অথচ ১৯৫১ সালে এই ভূখণ্ডে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২২ শতাংশ; ১৯৭৪ সালে ১৩.৫ শতাংশ, ২০১১ সালে ৮.৫৪ শতাংশ। কোনো মহামারী এভাবে একটি জনগোষ্ঠীকে কমায়নি; কমিয়েছে ভয়, দখল আর দেশত্যাগ। যে দেশে ৯১ শতাংশ মানুষ একই ধর্মের, সেখানে ধর্মকে 'বিপন্ন' ঘোষণা করাটা রাজনৈতিক কৌতুকের উচ্চতম রূপ। ৯১ শতাংশ মানুষ যদি ঈমান নিয়ে নিরাপদ বোধ না করে, তবে বাকি ৯ শতাংশের নিরাপত্তার কথা ভাবতেই হয় না। ভাবার মতো কেউ অবশিষ্ট থাকে না।
দশকের পর দশক ধরে রাজনীতি ধর্মকে ভোটের ঝুড়িতে তুলেছে। এক দল 'রাষ্ট্রধর্ম' বসিয়েছে, আরেক দল হেফাজতের সঙ্গে চুক্তি করে পাঠ্যবই বদলেছে। যারা সেক্যুলারিজমের কথা বলেছেন, তারাই ক্ষমতার প্রয়োজনে ওয়াজ মাহফিলের মঞ্চে মাথায় টুপি পরেছেন। সেখান থেকে কেউ যখন মববাজ হয়ে বেরিয়ে আসে, তখন তারা বিস্ময় প্রকাশ করে। এ যেন কেউ বাঘের বাচ্চা পুষে বিস্মিত হচ্ছে যে, সে নিরামিষ খায় না কেন?
তাদের ধর্মীয় জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তুললে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ওঠার ঝুঁকি থাকে। এভাবে সমালোচনার পথ বন্ধ হয়, উগ্রতার পথ খোলা থাকে। এ এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে মাপার ফিতাই নিষিদ্ধ।
অগাস্ট ২০২৪-এর পর আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান জসীমউদ্দীন রাহমানীসহ কয়েক শ সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গিকে জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির যুক্তি দিয়েছেন, যা অযৌক্তিক নয়। কিন্তু যারা জঙ্গিবাদের মামলায় দণ্ডিত বা অভিযুক্ত, তাদের মুক্তির পর সমাজে কী বার্তা যায়—সে প্রশ্ন সরকারকে করতেই হবে।
গত দুই বছরে বাংলাদেশে পরিচয়ের রাজনীতি মহামারীর মতো ছড়িয়েছে। কে কী খায়, কী বিশ্বাস করে, কার কবরের রং কেমন—এসব এখন রাষ্ট্রীয় আলোচনার বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মন্দির চত্বরে গরু জবাই হয়, শ্মশানে গরুর মাংস রান্না হয়। এগুলো আপাতদৃষ্টিতে ক্ষুদ্র ঘটনা, কিন্তু প্রতীক হিসেবে বিশাল। যারা এসব করেন, তারা আসলে খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতার কথা বলছেন না; তারা জানান দিচ্ছেন—‘এই জায়গা আমাদের’। শ্মশান কারও বিশ্বাসের পবিত্র স্থান; সেখানে গরু রান্না করে প্রমাণ করা হয় যে, আপনার পবিত্রতার দাম আমাদের কাছে এক কেজি মাংসের সমান। এটা সাহসিকতা নয়, নেহাত অসভ্যতা।
এই রাজনীতির মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। গঙ্গাচড়ায় অভিযোগ ছিল একজন কিশোরের বিরুদ্ধে, আর ঘর পুড়েছে ২২টি পরিবারের। সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা হলো, যারা পরিচয়ের নামে সবচেয়ে উচ্চস্বরে চিৎকার করেন, তারা মানুষের বহুমাত্রিক পরিচয়ের কথা ভাবতেই চান না। একজন মানুষ একই সঙ্গে মুসলমান, শ্রমিক, সন্তান, প্রতিবেশী ও ভোটার হতে পারেন। কিন্তু এই রাজনীতির চোখে তিনি শুধুই 'ওরা' বা 'আমরা'।
শামীমের মৃত্যুর পর প্রশ্ন একটাই—ফেইসবুকে লাইভ করে মব জোগাড় করা ফজলুল হক আমিনীর বিচার হবে কি না? ভিডিও আছে, ফেইসবুক প্রোফাইল আছে, সাক্ষী আছে। প্রমাণের এত প্রাচুর্য সচরাচর মেলে না। যদি এবারও বিচার না হয়, তবে বুঝতে হবে সমস্যা সাক্ষ্যপ্রমাণের নয়, ইচ্ছার।
রাষ্ট্র যদি মবের কাছে বিচারের দায়িত্ব ছেড়ে দেয়, তবে একদিন সেই মব রাষ্ট্রের দরজাতেও কড়া নাড়বে। তখন আর ফেইসবুক লাইভের প্রয়োজন হবে না; সরাসরি সম্প্রচার চলবে আমাদের সবার ঘরে।
ড. মো. আবু নাসের: ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, বেকার্সফিল্ডের কমিউনিকেশনস বিভাগের চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জীবন বাজি রেখে ভিটেমাটি বেচে বিদেশে গিয়ে কেন অদক্ষ শ্রমিকদের মৃত্যুদণ্ডের মতো করুণ পরিণতি বরণ করতে হবে?
প্রিন্ট মিডিয়ার নিউজরুমে বসে দেখা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রভাব থেকে শুরু করে ডেটা জার্নালিজমের নবায়ন—তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে নিয়ে সাবেক সহকর্মী পলাশ দত্তের স্মৃতিচারণ।
ভারতে আগামী ১ নভেম্বর থেকে সিম কার্ডের নামেই মিলবে কলারের পরিচয়। থার্ড পার্টি অ্যাপ বা টাকা খরচ ছাড়া এমন মৌলিক সাইবার নিরাপত্তা সুবিধা বাংলাদেশের সাধারণ গ্রাহকদের দিতে টেলিকম অপারেটর ও বিটিআরসি কি উদ্যোগী হতে পারে না?
যে প্রবাসীদের আয়ে দেশের অর্থনীতি সচল থাকে, সংকটের দিনে ন্যূনতম আইনি সহায়তা না দিয়ে রাষ্ট্র কি নিজের প্রাথমিক দায়িত্ব এড়াতে পারে?