হোমপেজ লোড হচ্ছে…
বাংলার চিত্রকলার ব্যাকরণ কোথায়
অনার্য মুর্শিদ

‘প্রতিটি ছবির সামনে দাঁড়ালে চোখ কিছুক্ষণ থমকে থাকে। একবার দেখে চলে যাওয়ার মতো নয় ছবিগুলো ধীরে ধীরে পাঠ করতে হয়। লাবণ্যময় রং-রেখা, সংযত বিন্যাস ও সূক্ষ্ম বিবরণ মিলে তৈরি করে এক মায়াবী আবেশ। বাংলার লোকশিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্য, প্রাচ্যচিত্রের উত্তরাধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার ভাববৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার এই চিত্রমালার দৃশ্যভাষায় প্রবহমান।’
এভাবেই শুরু হয়েছে একটি চিত্র প্রদর্শনীর রিভিউ। প্রদর্শনীটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাচ্যকলা বিভাগের ‘বার্ষিক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী’র। ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রথম আলোর অন্য আলোর অনলাইনে ‘শিল্পভাষায় আত্মপরিচয় নির্মাণ’ শিরোনামে রিভিউটি লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যকলা বিভাগের শিক্ষক মলয় বালা।
এ লেখা কেস স্টাডি হিসেবে ধরে ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে আমরা মূল বিষয়বস্তুতে প্রবেশ করব। এখানে চারটি বাক্য আছে। কোনো বাক্যই বলছে না, এটা সুনির্দিষ্ট কোনো প্রদর্শনীর রিভিউ! দেশীয় প্রদর্শনীর সমস্ত চিত্রকলা প্রদর্শনীর রিভিউগুলো যে একটি সুনির্দিষ্ট ছাঁচের হয়ে উঠছে, এই রিভিউ তার উত্তম উদাহরণ। বৈচিত্র্য না থাকা দোষের কিছু নয়, কিন্তু যা বলা হচ্ছে তা ইতিহাসের নিরিখে কতটুকু যৌক্তিক? সমালোচক বলছেন, ‘বাংলার লোকশিল্পকে দীর্ঘ ঐতিহ্য, প্রাচ্যচিত্রের উত্তরাধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার ভাববৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার এই চিত্রমালার দৃশ্যভাষায় প্রবহমান।’ বাংলার চিত্রকলা কি সত্যিই প্রাচ্যচিত্রের উত্তরাধিকার? বাংলার চিত্রকলা কি সত্যিই লোকশিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্য?
এডওয়ার্ড সাঈদের ওরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যতত্ত্বও আমাদের তাই বলে। এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বের বাইরে প্রাচ্যকে কেউ এখনো বড় আকারে নতুন করে ব্যাখ্যা করতে পারেনি। এটাই সর্বশেষ হিসেবে ধরে নিতে হচ্ছে আমাদের। ইউরোপীয় সমালোচকেরা এই তত্ত্বের কিছু জায়গা সমালোচনা করলেও, সম্পূর্ণ ধারণাটি খারিজ করে দিতে পারেনি।প্রাচ্যচিত্র কি? প্রাচ্যচিত্র ধারণাটির কি কোনো ভিত্তি আছে? প্রাচ্যে তো ৩৬টি দেশ। ৩৬টি দেশ মিলে কখনো কি একটা শিল্পরীতি তৈরি করেছে? প্রাচ্যের মিসরীয় শিল্পরীতির সঙ্গে বঙ্গীয় শিল্পরীতির কি আদৌ কোনো মিল আছে? আরব-চীন-জাপানের চিত্রকলার সঙ্গে আমাদের চিত্রকলার মিল আছে কি? থাকলে এই মিলটা কবে থেকে হয়েছে? ওরিয়েন্টাল বা প্রাচ্যকলার ধারণা হওয়ার পর থেকেই এই মিলটা আমরা পাচ্ছি। প্রাচ্যকলার ধারণা যতটা না সাংস্কৃতিক কারণে তৈরি হয়েছে, তার চেয়ে বেশি এটা তৈরি হয়ে রাজনৈতিক কারণে। আমরা সবাই জানি পশ্চিম এই বিভাজন করেছে প্রাচ্যকে শাসনের প্রয়োজনে। এডওয়ার্ড সাঈদের ওরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যতত্ত্বও আমাদের তাই বলে। এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বের বাইরে প্রাচ্যকে কেউ এখনো বড় আকারে নতুন করে ব্যাখ্যা করতে পারেনি। এটাই সর্বশেষ হিসেবে ধরে নিতে হচ্ছে আমাদের। ইউরোপীয় সমালোচকেরা এই তত্ত্বের কিছু জায়গা সমালোচনা করলেও, সম্পূর্ণ ধারণাটি খারিজ করে দিতে পারেনি।
ভারতের অমরাবতী স্তূপের চুনাপাথরের গম্বুজাকার শিলাখণ্ড, খ্রিস্টীয় ৫০–১০০ অব্দসমালোচক বাংলার চিত্রকলাকে যে প্রাচ্যচিত্রের উত্তরাধিকার বলছেন, তার পেছনে তিনি লেখায় একটি যুক্তিও দিয়েছেন। শেষ লাইনে তিনি বলছেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার ভাববৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার এই চিত্রমালার দৃশ্যভাষায় প্রবহমান।’ তবে এর পূর্বসূরি কারা। লেখক মলয় বালা এই রিভিউতেই জবাব দিচ্ছেন, ‘এই শিল্পভাবনার ঐতিহাসিক শিকড় খুঁজতে গেলে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কথা অনিবার্যভাবেই সামনে আসে। তাঁর শিল্পচেতনার গভীরে ছিল দেশ, মাটি, মানুষ ও প্রাচ্য সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ। পঞ্চাশের দশকে ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পদৃষ্টিতে নতুন মাত্রা যোগ করলেও তিনি দেশীয় শিল্প–ঐতিহ্যের শিকড়ের সন্ধান থেকে বিচ্যুত হননি। বরং আধুনিক শিল্প-অভিজ্ঞতাকে দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়াসে তাঁর আগ্রহ ও উদ্যোগে তৎকালীন গভর্নমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউটে প্রাচ্যকলা বিভাগের সূচনা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন চিত্র–ঐতিহ্য, বেঙ্গল স্কুল, মিনিয়েচার ও লোকশিল্পের চর্চার মধ্য দিয়ে দেশীয় শিল্পভাষার বিকাশের যে ভিত্তি তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তারই একটি ধারাবাহিক প্রতিফলন আজকের এই চিত্রচর্চায় দেখা যায়।’ এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশের পূর্বসূরি জয়নুল হলেও গোটা ভারতবর্ষে এর পূর্বসূরি হলেন নন্দলাল বসু, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং যামিনী রায়ের মতো শিল্পী ও শিল্পবোদ্ধারা। তাঁদের বেঙ্গল স্কুলের ধারণাই মূলত এখানে প্রাচ্যকলার ধারণা দেয়। এই প্রাচ্যকলাকেই তাঁরা বেঙ্গল স্কুল হিসেবে পরিচিত করাতে লাগলেন। এখনো বাংলাদেশের কোথাও ‘বঙ্গীয় শিল্পকলা’ নামে আলাদা কোনো বিভাগ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিভাগ প্রাচ্যকলা নামেই রয়েছে। অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বঙ্গীয় শিল্পকলা’ বা ‘প্রাচ্যকলা বিভাগ’ নেই। আমাদের যেসব পূর্বসূরি শিল্পবোদ্ধারা এই বিভাগ খুলেছেন, তা এই উত্তর-ঔপনিবেশিক সময়ে এসে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। কারণ, প্রাচ্যকলা ধারণাটিই সদ্য আরোপিত একটি ধারণা। যে ধারণার বয়স সাকল্যে তিন শ বছর।
এই বিভাগ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সম্পর্কে বিভাগের শিক্ষক দীপ্তি রানী দত্ত তাঁর ‘প্রাচ্যকলা বিভাগ: প্রতিষ্ঠাকালীন বাস্তবতা’ প্রবন্ধের শুরুতে উল্লেখ করেন, ‘জয়নুল আবেদিন ১৯৩৩ সালে কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। দেশভাগের কারণে ১৯৪৮ সালে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত জয়নুল কলকাতা আর্ট স্কুল ত্যাগ করেন ঢাকায় আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে। ১৯৪৮ সালেই তিনি তা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। জয়নুল যে শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সূচনা করেন, তার শিক্ষাপদ্ধতি কলকাতা আর্ট স্কুলের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। সম্ভবত ওই শিক্ষাপদ্ধতিকে অনুসরণ করেই জয়নুল ১৯৫৫ সালে নতুন আরেকটি বিভাগ—প্রাচ্যকলা শুরু করেছিলেন।’
শিকারির বেশে শিবকে চিত্রিত করা পোড়ামাটির ফলক, ভারত, আনুমানিক খ্রিস্টীয় ৪০০–৫০০ অব্দঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও চারুশিল্পের সম্পাদক নজরুল ইসলাম এক সাক্ষাৎকারে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে প্রশ্ন করেন, আপনি যখন কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন, তখন তো বাংলাদেশে চিত্রকলায় অবনীন্দ্র নাথের নেতৃত্বে ভারতীয় তথা ওরিয়েন্টাল আর্টকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার একটা আন্দোলন চলছিল। কিন্তু আপনি ইউরোপীয় চিত্রাঙ্কন পদ্ধতি বেছে নিয়েছিলেন। কারণ কী?
জবাবে শিল্পাচার্য বলেন, আসলে মুকুল দে–ও আমাকে ওরিয়েন্টাল আর্টেই যেতে উপদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু আমার মারাত্মক দুর্বলতা ছিল ইউরোপীয় চিত্রাঙ্কন রীতির প্রতি। আমি ছোটবেলা থেকেই নিসর্গ থেকে ছবি এঁকেছি। সেই আঁকার রীতি আমার নিজস্ব এবং বস্তুত ইউরোপিয়ান একাডেমিক পদ্ধতির। মনে হতো, ওভাবেই প্রকৃতির দৃশ্যাবলি, গাছপালা, নদী ইত্যাদি আমি ঠিকভাবে দেখাতে পারব। ওরিয়েন্টাল রীতি তো বেশ স্টাইলাইজ, তাতে যেন তৃপ্তি পেতাম না। (সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ৩৯তম সংখ্যা, ১৫ মার্চ ১৯৭৪)
এখনো বাংলাদেশের কোথাও ‘বঙ্গীয় শিল্পকলা’ নামে আলাদা কোনো বিভাগ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিভাগ প্রাচ্যকলা নামেই রয়েছে। অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বঙ্গীয় শিল্পকলা’ বা ‘প্রাচ্যকলা বিভাগ’ নেই। আমাদের যেসব পূর্বসূরি শিল্পবোদ্ধারা এই বিভাগ খুলেছেন, তা এই উত্তর-ঔপনিবেশিক সময়ে এসে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। কারণ, প্রাচ্যকলা ধারণাটিই সদ্য আরোপিত একটি ধারণা। যে ধারণার বয়স সাকল্যে তিন শ বছর।স্বয়ং শিল্পাচার্য যখন তাঁর ইউরেসেন্ট্রিক মানসিকতার কথা প্রকাশ করছেন, তখন কি আমাদের সাবধান হওয়া উচিত নয়? সেই সময়ের পরিস্থিতিতে তিনি যতটুকু সম্ভব আমাদের এগিয়ে দিয়ে গেছেন, আমাদের জন্য শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক দ্বার উন্মোচন করেছেন। এই সময়ে এসে আমরা যদি পূর্বসূরিদের পুনর্মূল্যায়ন না করি, তবে এটা তাদের প্রতিও অবিচার করা হবে। কারণ, তারা এই প্রাচ্যকলা ধারণাটি তৈরি করেছে কোনো না কোনো পূর্বধারণা ভেঙে। কতগুলো দেশের একটা সমন্বিত সংস্কৃতি বাস্তবসম্মত কি না তা শুধু প্রশ্নসাপেক্ষই নয়, সম্ভবত এই চিন্তা করাটা এই সময়ের অপরাধ। বাংলাদেশে আমরা যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে অন্য আদিবাসীদেরও এক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে চাই, এটা সে ধরনের একটি অপরাধ। বহুজাতিক রাষ্ট্রের একক সংস্কৃতির ধারণাটি যদি সঠিক হতো, তবে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হয় না।
৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রথম আলোর অন্য আলোর অনলাইনে ‘শিল্পভাষায় আত্মপরিচয় নির্মাণ’ শিরোনামে রিভিউটি লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচ্যকলা বিভাগের শিক্ষক মলয় বালা।প্রাচ্যকলা বা প্রাচ্যচিত্রের ধারণা আমাদের চারুকলার শিক্ষার্থীরা মর্মে মর্মে অনুধাবন করেন বলে হীনম্মন্যতায়ও ভুগছেন। পশ্চিম আমাদের মধ্যে এই হীনম্মন্যতাই তৈরি করতে চেয়েছিল। সে ক্ষেত্রে তারা সফলও হয়েছে। আমাদের চিত্রশিল্পীদের অধিকাংশ সব সময়ই বিদেশমুখী। দেশীয় মিডিয়ামেও তারা আর ছবি আঁকতে পছন্দ করে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই প্রাচ্যকলা বিভাগের শিক্ষক মো. রকিবুল হাসান অতিসাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে লেখেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চারুকলা অনুষদে ‘পেইন্টিং’ বা পশ্চিমা তৈলচিত্রকে বানানো হয়েছে ‘আধুনিকতা’র প্রতীক। আর আমাদের নিজস্ব মাটি ও রীতির ‘প্রাচ্যকলা’ (Oriental Art)-কে কেবল ব্যাকডেটেড বা অতীতমুখী ঐতিহ্য বানিয়ে এক পাশে সরিয়ে রাখা হয়েছে।
এটা কি কেবলই অনিচ্ছাকৃত? নাকি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চক্রান্ত? আমাদের মনস্তত্ত্বকে পরাধীন করে রাখার ফলে শিক্ষার্থীরা আজ নিজেদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগছে।
নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে ফেলে পশ্চিমা ফ্রেমে বন্দী করার এই ষড়যন্ত্র ভাঙার সময় এসেছে। চারুকলা সংস্কার হোক, বাংলাদেশের শিল্পকলা থেকে ঔপনিবেশিক আধিপত্য নিপাত যাক, বাংলার নিজস্ব শিল্পভাষা মুক্তি পাক।
বঙ্গীয় শিল্পকলা নিয়ে দ্রাবিড় সৈকতের বই।মলয়বালার চিত্রপ্রদর্শনীর রিভিউতে লেখা ‘বাংলার লোকশিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্য’ ধারণাটিও যে একটি গোলকধাঁধা, তার উত্তর পাই এই সময়ের চিত্রশিল্পী ও গবেষক ড. দ্রাবিড় সৈকতের গবেষণাকর্মে। ‘বাঙলার চিত্রকলা : ইউরোপমুখীতার মর্মভেদ’ বইয়ে দ্রাবিড় সৈকত বলতে চেয়েছেন, সত্যিকারার্থে বাংলার চিত্রকলা বলে যে চিত্রকলাগুলোকে আমরা সামনে আনছি, তা মূলত লোকশিল্প। লেখকের মতে, এই জীর্ণ আদিপ্রকরণের শিল্প কখনোই বাঙালির শিল্প ছিল না, বাঙালির চিত্রকলায়ও আছে যথেষ্ট গাণিতিক ফর্মুলা, যা আমাদের একটি উন্নততর সাংস্কৃতিক পথ রচনা করতে সক্ষম। শুধু পথ রচনা করেই ক্ষান্ত হননি তিনি। এই পথ যাতে অটল অটুট থাকে, তার জন্য সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন বঙ্গীয় শিল্পের রীতি, ব্যাকরণ, গাণিতিক ফর্মুলা। তার ‘বঙ্গীয় শিল্পকলা: দেহতত্ত্বের দার্শনিক উত্তরাধিকার’ নামক বইটি পড়লে আমরা এই ধারণা সম্পর্কে আরও সুস্পষ্ট হব হয়তো।
বাংলা চিত্রকলার ব্যাকরণ কবে থেকে থেকে হারিয়ে গেল? কেন হারিয়ে গেল? কীভাবে হারিয়ে গেল? এই উত্তরগুলো খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি। এই ব্যাকরণ খুঁজতে গেলে আমাদের কেবল বাৎসায়ন, বরাহমিহির, নগ্নজিৎ, সমরাঙ্গন সূত্রধার, সরস্বতী কুমার পালের গাণিতিক ফর্মুলা ও নন্দনতাত্ত্বিক ঐতিহ্য অনুসরণ করলেই হচ্ছে না। কারণ, এগুলো সব কটিই বাংলার দর্শনের সঙ্গে যুক্ত। বাংলা-বঙ্গের দর্শন আসলে কী? এর প্রকৃত স্বরূপ নিয়ে যে বিতর্ক, তার অবসান কীভাবে হবে?ভারতীয় উপমহাদেশে মনীষীদের প্রণীত বাৎসায়নের ‘কামসূত্র’, বরাহমিহিরের ‘বৃহৎ সংহিতা’, নগ্নজিৎের ‘চিত্রলক্ষণ’, ভোজদেবের ‘সমরাঙ্গন সূত্রধার’ কিংবা সরস্বতী কুমারের পাল ‘চিত্রকলা’র মতো সুনির্দিষ্ট গাণিতিক ফর্মুলা ও দেহতাত্ত্বিক নন্দনতাত্ত্বিক ঐতিহ্য থাকার পরও আমরা ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিক আধুনিকতার প্রভাবে প্রভাবিত। তার প্রমাণ স্বয়ং চারুকলা নামটি। চারুকলা মানে কী? চারুকলা মানেই কি শিল্পকলা? শিল্পকলা মানেই কি চারুকলা? দুটি কি এক শব্দ? প্রতিষ্ঠার পর থেকে কখনো ব্যবচ্ছেদ করে দেখেছি কি? আমরা জানি চারু শব্দের অর্থ সুন্দর, আর কলা শব্দের অর্থ বিদ্যা। তবে সূচিশিল্প বা ব্র্যান্ডের পোশাকগুলোও কি শিল্প? এগুলোকে আমরা বড়জোর নান্দনিক বলতে পারি, শিল্প নয়। কেন শিল্প নয়, তা শিল্পের সংজ্ঞা পড়লেই আমরা বুঝতে পারব। চারুকলায় কি চারুচর্চা প্রাধ্যান্য পাবে, নাকি শিল্পচর্চা। আমরা চারুশিল্প এবং শিল্পকলাকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছি। যেটা জাদুঘরে থাকার কথা, গ্রামীণ ঐতিহ্য বিভাগে থাকার কথা, সেটা দখল করেছে শিল্পকলার স্থানে। কারুশিল্পের দক্ষতা আর সৃজনশীলতাকে আমরা এক রেখায় দেখছি।
অজন্তা গুহার ভেতরে প্রাচীন ২৪ ফুট দীর্ঘ শায়িত বুদ্ধমূর্তিবাংলা চিত্রকলার ব্যাকরণ কবে থেকে থেকে হারিয়ে গেল? কেন হারিয়ে গেল? কীভাবে হারিয়ে গেল? এই উত্তরগুলো খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি। এই ব্যাকরণ খুঁজতে গেলে আমাদের কেবল বাৎসায়ন, বরাহমিহির, নগ্নজিৎ, সমরাঙ্গন সূত্রধার, সরস্বতী কুমার পালের গাণিতিক ফর্মুলা ও নন্দনতাত্ত্বিক ঐতিহ্য অনুসরণ করলেই হচ্ছে না। কারণ, এগুলো সব কটিই বাংলার দর্শনের সঙ্গে যুক্ত। বাংলা-বঙ্গের দর্শন আসলে কী? এর প্রকৃত স্বরূপ নিয়ে যে বিতর্ক, তার অবসান কীভাবে হবে? দ্রাবিড় সৈকত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছেন। তাঁর ‘ফ্রয়েডীয় লিবিডো তত্ত্ব এবং তান্ত্রিক দেহাত্মবাদ’ বইয়ে বাংলার দর্শনের একটি রূপরেখা পাওয়া যাবে। বইটিতে বলা হয়, ‘প্রথানুসারে ভারতীয় দার্শনিক সম্প্রদায় নয়টি (চার্বাক, বৌদ্ধ, জৈন, সাংখ্য, যোগ, ন্যায়, বৈশেষিক, মীমাংসা, বেদান্ত) ধারায় বিভক্ত। সাধারণত তান্ত্রিক মতাদর্শকে আলাদা করে দার্শনিক সম্প্রদায় হিসেবে উল্লেখ করা হয় না। কিন্তু গভীর পর্যবেক্ষণে দেখা যাবে ভারতীয় দর্শনধারায় তন্ত্রই হবার কথা ছিল প্রথম দার্শনিক সম্প্রদায়। কেন তন্ত্রকে আলাদা করে দর্শনপ্রস্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয় না, সেটি বিস্তারিত আলোচনার বিষয় হতে পারে।’ এই বইটিও আমাদের চিত্রকলার দর্শন খোঁজার একটি আকরগ্রন্থ হিসেবে মূল্যায়িত হতে পারে আমাদের কাছে।
বাংলাদেশে এখন সংস্কারের হাওয়া চলছে। চারুকলা যদি এই সময়ে এসেও সংস্কার না হয়, আর কখন হবে? প্রচলিত একাডেমিক কাঠামোর পরিবর্তন, ‘প্রাচ্যকলা’ বা ‘ফোক’ শব্দাবলির রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক সমালোচনার কারণে প্রতিষ্ঠানের কিছু প্রবীণ শিক্ষকের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া বা অসহযোগিতা আসবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। তাই বলে শিল্পীরা দেশীয় শিল্পের ব্যাকরণ খুঁজবে না, চারুকলার সংস্কার করবে না, এটা এখনো মানা যায় না। কারণ, এ দেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে চারুকলার ভূমিকা আছে।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের একটা লেখা দিয়ে শেষ করতে চাই, ‘আমাদের এ ধরনের শিল্পীদের অধিকাংশই কিছুটা অপরিণত বয়সে বিদেশে গিয়েছিল এবং গিয়ে সেখানে যেসব চিত্রাঙ্কন ধারা দেখেছে, তাতে তাদের চোখ আটকে গিয়েছিল এবং সেই সব ধারাকে অনুসরণ করে তারা ছবি এঁকেছে, ভালো ছবিও এঁকেছে, কিন্তু আমার মনে হয় ওরা যতই পরিণত হবে, ততই আবার প্রকৃতিতে, জীবনে, জনতায় ও স্বপরিবেশের মধ্যে ফিরে আসবে। নিজ ঐতিহ্য ও নিজ জনমানুষকে তারা জানতে পারবে এবং তাদের চিত্রকলায় তা ফুটাতেও পারবে।’
অনার্য মুর্শিদ
গবেষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা
মঙ্গলবার আলজিয়ার্সে আলজেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী সাইফি গরিবের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎকালে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়।
মাগুরা পৌরসভার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে কাউন্টারে দায়িত্বরত অবস্থায় শাকের হোসেন (৩৯) নামের যুবদলের এক নেতা মারা গেছেন। আজ বুধবার ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে পারনান্দুয়ালী টার্মিনালের রয়েল পরিবহনের বাস কাউন্টারে এ ঘটনা ঘটে।
পাহাড়ের সবুজের ফাঁকে কোথাও উজ্জ্বল লাল, কোথাও সোনালি হলুদ, আবার কোথাও নীল-বেগুনি রঙের ঝলক।